

হাফলং (অসম), ১২ আগস্ট (হি স) ডিমা হাছাও জেলায় ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি সরকারি কাজে ডিমাসা ভাষার স্বীকৃতি লাভের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক ঐতিহাসিক আবহ। বুধবার এই বিষয়ে জানা গেছে। ডিমাসা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে হাফলং জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান “গ্রাওডিমা খে মান ইয়াওফানে মেল-মাজাং”। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ডিমাসা ভাষার সরকারি স্বীকৃতিকে ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর কাছাড় পার্বত্য স্বশাসিত পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য দেবোলাল গার্লোসা, পরিষদের অধ্যক্ষ মোহিত হোজাই বিধায়ক রূপালি লাংথাসা, অবসরপ্রাপ্ত এএসিএস আধিকারিক তথা ডিমাসা লায়রিদিম মেল-এর সভাপতি রমেশ থাওসেন-সহ পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য এবং পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন আধিকারিকরা। অনুষ্ঠানে ডিমাসা ভাষার সরকারি স্বীকৃতিকে ডিমাসা সমাজের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, একটি ভাষার সরকারি স্বীকৃতি শুধু প্রশাসনিক ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে না, একই সঙ্গে সেই ভাষার মর্যাদা, সংরক্ষণ ও বিকাশের পথও প্রশস্ত করে। ডিমা হাছাও জেলায় সরকারি কাজে ইংরেজির পাশাপাশি ডিমাসা ভাষার ব্যবহার শুরু হওয়া তাই ভাষাটির ভবিষ্যৎ বিকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অনুষ্ঠানে ডিমাসা ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার, উন্নয়ন ও সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁদের গবেষণা, লেখালেখি, ভাষাচর্চা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ডিমাসা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এই উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় “জেংখ্লংমন্দর: ইয়াওয়াইসাইনথি বেলেব লায়রিমিন-৩” শীর্ষক গ্রন্থ। জানা গেছে, ডিমাসা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে পড়াশোনার কাজে বইটি পৌঁছে দেওয়া হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে ডিমাসা ভাষার সাহিত্য পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগকে ভাষা শিক্ষার প্রসার এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক মহলের মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার সুযোগ যত বাড়বে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্কও তত বেশি দৃঢ় হবে। বিশেষ করে বিদ্যালয়গুলিতে ডিমাসা ভাষার বই পৌঁছে দেওয়া হলে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড় সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাবে।
অনুষ্ঠানে ডিমাসা ভাষা ও সাহিত্যকে ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহার বাড়ানো, সাহিত্যচর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করা, ভাষাবিষয়ক গবেষণার পরিধি বিস্তৃত করা এবং তরুণ লেখক ও গবেষকদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে। ডিমাসা ভাষার সরকারি স্বীকৃতির এই সাফল্যের নেপথ্যে যাঁদের দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টা রয়েছে, তাঁদের প্রতিও অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। লেখক, গবেষক, ভাষাকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে ডিমাসা ভাষার উন্নয়নে কাজ করে আসা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেই এই সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ডিমা হাছাও জেলায় সরকারি কাজে ডিমাসা ভাষার স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে ভাষা ও সাহিত্যকে বিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ এই স্বীকৃতিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। ভাষার সরকারি মর্যাদা এবং নতুন প্রজন্মের হাতে নিজস্ব ভাষার সাহিত্য তুলে দেওয়ার এই যুগপৎ উদ্যোগ ডিমাসা ভাষার ভবিষ্যৎ বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ফলে “গ্রাওডিমা খে মান ইয়াওফানে মেল-মাজাং” অনুষ্ঠানটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে নয়, ডিমাসা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকল।
হিন্দুস্থান সমাচার / বিশাখা দেব