
সোনালি দাস
কলকাতা, ১৪ আগস্ট (হি. স.) : ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট– এই দিনে ভারত দীর্ঘ ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পায়। এটি আমাদের জাতীয় গৌরব, বীর শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণের এবং দেশপ্রেমের পবিত্র দিন। কিন্তু এই যে অর্জিত স্বাধীনতা, তার নেপথ্যের রক্তঝরা পথটি কেবল কয়েকটি সুপরিচিত নামের ওপর ভর করে তৈরি হয়নি। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মাস্টারদা সূর্য সেন কিংবা ক্ষুদিরাম বসুর মতো মহামানবদের বীরত্বগাথা আমাদের রক্তে শিহরণ জাগায় ঠিকই; কিন্তু এই ঐতিহাসিক ক্যানভাসের পেছনে ঢাকা পড়ে আছেন এমন অনেক বিপ্লবী, যাঁদের অপরিসীম সাহস, মেধা, এবং আত্মত্যাগ না থাকলে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত। ইতিহাসের মূলধারার আলো থেকে বহু দূরে, নিঃশব্দে দেশের জন্য নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিলেন যাঁরা, তাঁদেরই বলা হয় ‘আনসাং হিরো’ । স্বাধীনতা দিবসের এই বিশেষ ক্ষণে জেনে নেওয়া যাক স্বাধীন ভারতের ভিত গড়ে দেওয়া বাংলার এমনই চারজন অবিস্মরণীয় অথচ বিস্মৃত বীর বিপ্লবীর অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।
উল্লাসকর দত্ত: বিজ্ঞানাগার থেকে সশস্ত্র বিপ্লবের রূপকার
১৮৮৫ সালে ত্রিপুরায় জন্মগ্রহণ করা উল্লাসকর দত্ত ছিলেন তদানীন্তন বাংলার এক অসাধারণ মেধাবী তরুণ। প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র উল্লাসকর শুধু বইয়ের পাতায় নিজের জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, খালি হাতে বা কেবল সভা-সমিতি করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব নয়; ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের জবাবে চাই সমকক্ষ শক্তি। সেই ভাবনা থেকেই তিনি যুক্ত হন ঐতিহ্যবাহী অনুশীলন সমিতির সাথে।
বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে উল্লাসকর তৈরি করে তোলেন মানিকতলা ও মুরারিপুকুর বাগানের গোপন গবেষণাগার। ব্রিটিশ পুলিশকে হতবাক করে দিয়ে এই তরুণ রসায়নবিদ নিজের মেধা ও গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা ও বিস্ফোরক। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে যে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসু, সেই বোমার মূল কারিগর ছিলেন এই উল্লাসকর দত্ত।
আলিপুর বোমা মামলায় পুলিশ যখন তাঁকে গ্রেফতার করে, তখন বিচারক বার্নস অ্যান্ডারসন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কিন্তু ফাঁসির আদেশ শুনেও আদালতে দাঁড়িয়ে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন এই তরুণ। পরবর্তীতে আপিলে তাঁর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয় এবং পাঠানো হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে।
আন্দামানের রিমোট দ্বীপে সেলুলার জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁর ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। দিনের পর দিন ঘানি ঘোরানো, মারধর এবং অনাহারের ফলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তবুও তিনি ব্রিটিশদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। স্বাধীনতার পর, ইতিহাস ও প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে, অসমের শিলচরে একপ্রকার নিঃসঙ্গভাবে ১৯৬৫ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান বিপ্লবী।
বীণা দাস: সমাবর্তন মঞ্চের বীরাঙ্গনা ও সাম্রাজ্যবাদের বুকে গুলি
১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে উপস্থিত তৎকালীন সুধী সমাজ। সমাবর্তন বক্তৃতা দিচ্ছেন বাংলার প্রতাপশালী ও অত্যাচারী ব্রিটিশ গভর্নর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন। চারদিকে কড়া পুলিশি পাহারা। কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক ২১ বছরের তরুণীর দেশপ্রেমের প্রদীপ্ত শিখা। ডিগ্রি নেওয়ার নাম করে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন বিএ-র ছাত্রী বীণা দাস।
হঠাৎই নিজের গ্র্যাজুয়েশন গাউনের ভেতর থেকে রিভলভার বের করে একেবারে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গভর্নরকে লক্ষ্য করে পর পর পাঁচ রাউন্ড গুলি চালান বীণা। যদিও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে গভর্নর বেঁচে যান এবং পুলিশ তৎক্ষণাৎ বীণাকে চেপে ধরে, কিন্তু সেই মুহূর্তে ২১ বছরের এক মেয়ের চোখের অগ্নিশিখা কাঁপিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সমগ্র ব্রিটিশ রাজপরিবারকে।
আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে অস্বীকার করেন বীণা দাস। নিজের জবানবন্দিতে তিনি নির্ভীক কণ্ঠে লিখেছিলেন:
“আমি কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাইনি। আমি আঘাত করতে চেয়েছিলাম সেই সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থাকে, যা আমার দেশকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে এবং আমার দেশবাসীর ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে।”
আদালত তাঁকে ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। কিন্তু স্বাধীন ভারতে এই বীরাঙ্গনার শেষ জীবন কেটেছিল চরম দারিদ্র্য, অবহেলা ও একাকীত্বের মধ্যে। উত্তরাঞ্চলের ঋষিকেশে ৮৬ বছর বয়সে যখন তিনি মারা যান, তখন তাঁর মৃতদেহ রাস্তার ধারে পড়েছিল লাওয়ারিশ হিসেবে। স্বাধীন ভারতের এই এক করুণ ও লজ্জাজনক ইতিহাস।
হেমচন্দ্র কানুনগো : ভারতের প্রথম বিপ্লবী পতাকার রূপকার
মেদিনীপুরের রাধানগরে জন্মানো হেমচন্দ্র কানুনগো ছিলেন একাধারে উঁচুমানের চিত্রশিল্পী, অন্যদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী। তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন, আবেগ দিয়ে বিপ্লব হয় না, তার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তি। ১৯০৬ সালে বিপ্লবকে বৈজ্ঞানিক রূপ দিতে তিনি নিজের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাড়ি দেন ফ্রান্সে।
প্যারিসে গিয়ে তিনি মেকানিক্স, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সামরিক কায়দায় বোমা তৈরির গোপন কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে ভারতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনকে তুলে ধরতে তিনি কাজ শুরু করেন।
১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে আন্তর্জাতিক সোশালিস্ট কংগ্রেসে বিপ্লবী মাদাম ভিকাজী কামা যে ত্রিবর্ণরঞ্জিত ‘বন্দে মাতরম্’ খচিত ঐতিহাসিক পতাকাটি উন্মোচন করেছিলেন, তার মূল নকশাকার ছিলেন এই হেমচন্দ্র কানুনগো। পরবর্তীতে ভারতে ফিরে তিনি মানিকতলার আস্তানায় তরুণ বিপ্লবীদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও বোমা তৈরির শিক্ষা দিতে থাকেন।
আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেফতার হয়ে তাঁকেও আন্দামান দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। স্বদেশী আন্দোলনের বহু মোড় ঘোরানো ঘটনার প্রধান স্থপতি হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসে হেমচন্দ্র কানুনগোর নাম আজও অনেকটাই উপেক্ষিত।
লীলা নাগ (রায়): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী থেকে নারী বিপ্লবীদের সংগঠক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সহ-শিক্ষার্থী বা প্রথম ছাত্রী ছিলেন লীলা নাগ। কিন্তু কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিজের পরিচয় সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অত্যন্ত আস্থাভাজন এই নারী বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ অর্থাৎ নারীদের সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত না করতে পারলে স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হওয়া সম্ভব নয়।
১৯২৩ সালে তিনি ঢাকায় গড়ে তোলেন ‘দীপালি সংঘ’। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সামাজিক সংগঠন মনে হলেও, এর আসল কাজ ছিল মহিলাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা, তাঁদের লাঠিখেলা, ডাবল-ড্যাগার চালানো, পিস্তল চালানো এবং আত্মরক্ষার সামরিক শিক্ষা দেওয়া। সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়িকা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এই ‘দীপালি সংঘ’-তেই প্রথম বিপ্লবী দীক্ষা লাভ করেছিলেন।
নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরতে তিনি ‘জয়শ্রী’ নামে একটি বিপ্লবী সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন। নেতাজি যখন ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন, তখন তার কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটিতে একমাত্র মহিলা সদস্য ছিলেন এই লীলা নাগ। দেশভাগের যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি সারা জীবন তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় উদ্বাস্তু ও নিপীড়িত মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
ক্ষুদিরাম বসু বা মাস্টারদার আত্মত্যাগ যেভাবে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, ঠিক তেমনই উল্লাসকর দত্তের বিজ্ঞান-সাধনা, বীণা দাসের আত্মমর্যাদা, হেমচন্দ্রের দূরদর্শিতা এবং লীলা নাগের নারী শক্তি জাগরণের অবদানও একইভাবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম হয়তো বড় হরফে লেখা হয়নি, কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্ব ও মুক্ত বাতাসের প্রতিটি কণিকায় মিশে রয়েছে তাঁদের অলিখিত রক্তধারা। এই ‘আনসাং হিরো’দের যথাযোগ্য সম্মান দেওয়াই হোক আমাদের প্রকৃত দেশপ্রেম।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি