
সৌমি বৈদ্য
দক্ষিণ ২৪ পরগনা (বজ বজ), ১৪ আগস্ট (হি.স.) : স্বাধীনতার ৮০ বছর। ১৫ আগস্টের সকালে জাতীয় পতাকা যখন উড়বে, তখন স্বাধীনতার ইতিহাসের পরিচিত অধ্যায়ের পাশাপাশি মনে পড়বে এমন কিছু ঘটনা, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের দূরবর্তী প্রান্ত, বিদেশের মাটি এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্ন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজ তেমনই এক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এক শতাব্দীরও বেশি আগে এই মাটিতে এসে থেমেছিল কোমাগাটা মারু-র দীর্ঘ ও বেদনাময় যাত্রা।
১৯১৪ সালে কানাডার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল জাপানি জাহাজ কোমাগাটা মারু। জাহাজে ছিলেন ৩৭৬ জন ভারতীয়। তাঁদের অধিকাংশই পাঞ্জাবি শিখ হলেও হিন্দু ও মুসলিম যাত্রীও ছিলেন। বাবা গুরদিত সিংয়ের নেতৃত্বে এই যাত্রার পিছনে ছিল বিদেশের মাটিতে ভারতীয়দের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। কানাডার বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতির কারণে তাঁদের সেখানে নামতে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাহাজটিকে ভারতে ফিরে আসতে হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর বজবজে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ব্রিটিশ প্রশাসন যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের গুলিতে ১৯ জন যাত্রী নিহত হন, বহু মানুষ আহত হন এবং অনেকে গ্রেফতার হন। বিদেশের মাটিতে শুরু হওয়া অধিকার ও আত্মমর্যাদার সেই লড়াই এভাবেই বাংলার মাটিতে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে পরিণত হয়।
কোমাগাটা মারুর স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৫২ সালে বজবজের কাছে শহিদদের স্মরণে একটি স্মারক নির্মাণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালে বজবজ রেলস্টেশনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কোমাগাটা মারু বজবজ’। প্রতিদিনের যাতায়াতের ব্যস্ততার মধ্যেও স্টেশনের নামটি আজও এক শতাব্দী আগের সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়।
কোমাগাটা মারু তাই শুধু একটি জাহাজের ইতিহাস নয়। এটি ঔপনিবেশিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদার দাবি এবং স্বাধীনতার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অধ্যায়।
১৫ আগস্টের ভারতকে বুঝতে গেলে তাই শুধু রাজধানীর দিকে তাকালেই হয় না। কখনও কখনও ফিরে তাকাতে হয় বজবজের দিকেও—একটি রেলস্টেশনের নামের মধ্যে যেখানে আজও ইতিহাস কথা বলে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য