
কলকাতা, ১৩ আগস্ট (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গে মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে জবাব তলব করেছে। রাজ্য সরকারের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ আবেদনের শুনানির সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অন্তরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্য সরকার নির্দেশ দিয়েছে যে, মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশ জারি করা হয়েছে কি না এবং পুলিশ লাউডস্পিকার বন্ধ করার জন্য মসজিদে গিয়ে ধমক বা হুমকি দিচ্ছে কি না, তা ১৮ আগস্টের মধ্যে স্পষ্ট করতে হবে।
এই জনস্বার্থ মামলাটি সোমবার আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি দায়ের করেছিলেন। আবেদনকারীর অভিযোগ, রাজ্য সরকার মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের জন্য লিখিত কোনো আদেশ বা সরকারি বিজ্ঞপ্তির পরিবর্তে কেবল মৌখিক নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার মামলার শুনানির সময় আবেদনকারীর তরফে দাবি করা হয়, রাজ্য জুড়ে আজানের জন্য ব্যবহৃত প্রায় চার হাজার মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার খুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ করা হয়, পুলিশ মসজিদের ইমামদের থানায় ডেকে বা ফোনের মাধ্যমে লাউডস্পিকার সরানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে এবং অনেক জায়গায় পুলিশ কর্মীরা সরাসরি মসজিদেও পৌঁছে গেছেন।
কল্যাণ ব্যানার্জি আদালতে আরও অভিযোগ করেন, এক জায়গায় পুলিশ কর্মী জুত পরা অবস্থায় মসজিদের ছাদে উঠে লাউডস্পিকার খুলেছেন। তবে, এই সমস্ত অভিযোগই আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে করা দাবি এবং এর কোনো স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
আবেদনকারী শব্দদূষণ সম্পর্কিত নিয়মাবলি এবং পূর্বের বিচার বিভাগীয় নির্দেশনার প্রতিও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, নিয়ম মেনে সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত লাউডস্পিকার ব্যবহারে কোনো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই। যদি কোথাও শব্দের মাত্রা বা নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন হয়, তবে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু রাজ্যে লাউডস্পিকারের ব্যবহার নিয়ে লিখিত কোনো সরকারি আদেশের তথ্য দেওয়া হয়নি।
শুনানির সময় ডিভিশন বেঞ্চ আবেদনকারীর দাবির ওপর প্রশ্ন তোলে। আদালত জানতে চায়, চার হাজার লাউডস্পিকার সরানো হয়ে থাকলে তার ভিত্তি কী এবং সত্যিই কি কোনো লিখিত আদেশ জারি করা হয়েছিল? আদালত এও প্রশ্ন করে যে, সংশ্লিষ্ট মসজিদগুলি লাউডস্পিকার ব্যবহারের অনুমতির জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করেনি কেন?
কল্যাণ ব্যানার্জি জবাবে বলেন, রাজ্যে শব্দ সংক্রান্ত নিয়ম আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে এবং নিয়ম লঙ্ঘন হলে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, অনেক জায়গায় নিয়ম লঙ্ঘনের কোনো অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ মৌখিকভাবে লাউডস্পিকার বন্ধ বা সরানোর নির্দেশ দিয়েছে। তিনি শ্রীরামপুর, চাঁপদানি এবং রিষড়া অঞ্চলের বেশ কয়েকটি মসজিদের উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন যে কিছু মসজিদ জেলাশাসকের কাছে অনুমতির জন্য আবেদন করেছে।
রাজ্যের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র আবেদনের বৈধতা ও অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আবেদনে কোনো নির্দিষ্ট থানা, মসজিদ বা কর্মকর্তার স্পষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি। তাঁর যুক্তি ছিল, পুলিশ লাউডস্পিকার সরানোর নির্দেশ দিয়েছে— কেবল এটুকু বলাই যথেষ্ট নয়। যদি কোনো ঘটনার অভিযোগ করা হয়, তবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ নথি বা বিবরণ থাকা উচিত।
অ্যাডভোকেট জেনারেল জরিমানা সহ আবেদনটি খারিজ করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানান। এর ওপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য প্রশ্ন করেন— সরকারের বক্তব্য কি এই যে পুলিশ এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং লাউডস্পিকার ব্যবহার নিয়ে রাজ্যের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ জারি করা হয়নি? অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান যে এটিই রাজ্যের অবস্থান।
শুনানিকালে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়। তর্কাতর্কি এতটাই বেড়ে যায় যে দু'পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। আদালত হস্তক্ষেপ করে উভয় পক্ষকে সতর্ক করে এবং বিবাদ থামায়।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি