
আরামবাগ , ১৩ আগস্ট (হি.স.) : দক্ষিণ নারায়ণপুর গ্রামীণ হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি কোয়ার্টারের বেহাল দশা। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে হাসপাতাল চত্বরে থাকা একাধিক কোয়ার্টার কার্যত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বাইরে থেকে এক ঝলক দেখলে মনে হতে পারে পরিত্যক্ত কোনও ভূতবাংলো। অথচ এই কোয়ার্টারগুলিই একসময় হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। হাসপাতাল চত্বরে থাকা কোয়ার্টারগুলির প্রায় প্রতিটি বিল্ডিংয়েই এখন আগাছার জঙ্গল। কোথাও ছাদজুড়ে বড় বড় গাছ ও লতাপাতা, কোথাও আবার আগাছা জানালা পেরিয়ে ঘরের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। গাছের ডালপালা ছাদ ও জানালার চারপাশ ঢেকে ফেলেছে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না হওয়ায় কার্যত জঙ্গলের চেহারা নিয়েছে গোটা এলাকা।
কোয়ার্টারগুলির জানালাতেও দেখা দিয়েছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। কোথাও কাঠের অংশে উই ধরেছে, কোথাও লোহার গ্রিলে মরচে পড়ে তা নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন জায়গায় দেওয়ালের চাঙর খসে পড়ছে। ছাদ ও দেওয়ালের অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। ফলে যে কোনও সময় আরও অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু পরিকাঠামোর বেহাল দশাই নয়, কোয়ার্টারগুলির চারপাশে সাপ, পোকামাকড় ও মশার উপদ্রবও বেড়েছে। আগাছার জঙ্গল এবং দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের বসবাসের জন্য পরিস্থিতি কার্যত অনুপযুক্ত হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য—দুই দিক থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই সরকারি আবাসন।
এই মুহূর্তে হাসপাতালের আটটি স্টাফ কোয়ার্টারের মধ্যে কয়েকটিতে কোনওরকমে রয়েছেন হাসপাতালের গাড়িচালক এবং গ্রুপ ডি কর্মীরা। কিন্তু চিকিৎসক কিংবা নার্সদের অধিকাংশই এই কোয়ার্টারে থাকতে চাইছেন না। ফলে হাসপাতালের কর্মীদের অনেককেই বাইরে থেকে যাতায়াত করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, গ্রামীণ হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের আবাসনের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনও চিকিৎসক বা নার্স হাসপাতাল চত্বরেই থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হয়। বিশেষ করে রাতের সময়ে কোনও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে হাসপাতালের কর্মীরা কাছাকাছি থাকলে পরিষেবা আরও দ্রুত দেওয়া সম্ভব। দক্ষিণ নারায়ণপুর গ্রামীণ হাসপাতালের উপর আশেপাশের অন্তত তিনটি পঞ্চায়েত এলাকার বহু গ্রামের মানুষ চিকিৎসার জন্য নির্ভরশীল। ফলে এই হাসপাতালের চিকিৎসা পরিকাঠামোর সঙ্গে কর্মীদের আবাসনের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত করলেই হবে না, চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার উপযুক্ত পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
রাজ্য সরকার বর্তমানে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে। বিভিন্ন গ্রামীণ হাসপাতালে উন্নত পরিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আধুনিক এবং বসবাসযোগ্য কোয়ার্টার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে চিকিৎসা পরিষেবাতেও। কিন্তু দক্ষিণ নারায়ণপুরের মতো পুরনো কোয়ার্টারগুলির ক্ষেত্রে নতুন করে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ না হলে সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও হাসপাতাল কর্মীদের একাংশের দাবি, দ্রুত এই কোয়ার্টারগুলির পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা করা হোক। প্রয়োজনে পুরনো ও বিপজ্জনক ভবন ভেঙে নতুন, আধুনিক এবং পর্যাপ্ত পরিকাঠামোযুক্ত আবাসন তৈরি করা হোক। চিকিৎসক ও নার্সরা যদি হাসপাতালের কাছেই নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য কোয়ার্টারে থাকতে পারেন, তাহলে জরুরি পরিষেবা আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একইসঙ্গে হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসা পরিষেবার মানও উন্নত হবে।
তাই প্রশ্ন উঠছে, যে গ্রামীণ হাসপাতালের উপর নির্ভর করে হাজার হাজার মানুষ, সেই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার জায়গা যদি এমন বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে? স্থানীয়দের একটাই দাবি, দ্রুত দক্ষিণ নারায়ণপুর গ্রামীণ হাসপাতালের সরকারি কোয়ার্টারগুলির হাল ফেরানো হোক। পরিত্যক্ত ভূতবাংলোর চেহারা নয়, চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক আবাসনই জরুরি। নতুন সরকার সেদিকেই এগচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। প্রতিটি ব্লক হাসপাতালে অত্যাধুনিক পরিকাঠামো যুক্ত কোয়ার্টার তৈরির লক্ষে নতুন প্রকল্প আনা হচ্ছে। এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামীণ চিকিৎসা ব্যবস্থার হাল ফিরবে বলেই মনে করছেন সাধারন মানুষ।
হিন্দুস্থান সমাচার / SANTOSH SANTRA