
চেন্নাই, ৫ আগস্ট (হি. স.): তামিলগা ভেট্রি কাঝগম (টিভিকে) সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট বুধবার তামিলনাড়ু বিধানসভায় পেশ করা হয়েছে। অর্থ দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্যের অর্থমন্ত্রী মারিয়া উইলসন সকাল ১০টায় বাজেট বক্তৃতা শুরু করে দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। শিক্ষা, নারীকল্যাণ, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, পর্যটন, কৃষি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের মোট আয় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার ২৭ কোটি টাকা হতে পারে। রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা এবং রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লক্ষ ৯৮ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত আরও দু’বছর সময় লাগবে।
নারীকল্যাণে বড় ঘোষণা
বাজেটে নারীকল্যাণে একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবারের সদস্য হিসেবে রাজ্যের সব মহিলাকে ৮ গ্রাম ওজনের সোনার মুদ্রা ও একটি রেশমি শাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮১২ কোটি টাকা। এছাড়া নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়াতে চালু হচ্ছে ‘সিঙ্গাপ্পেন ক্ষমতায়ন প্রকল্প’। মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে চলতি বছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার।
শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব
স্কুলশিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৪৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। ‘ভেত্রি মনিক্কণিনি’ প্রকল্পে খরচ হবে ৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পড়ুয়াদের ল্যাপটপ বিতরণ করা হবে। রাজ্যের ১০ হাজার সরকারি স্কুলে ‘সুপার ক্লিন, সুপার ক্যাম্পাস’ প্রকল্প চালু হবে। পাশাপাশি শিশুদের প্রাথমিক পরিচর্যা ও পুষ্টির জন্য ৫০০টি নতুন অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।
এআই ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র উপর বিশ্বমানের পাঠ্যক্রম তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং ও পলিটেকনিকের ৫ লক্ষ যুবক-যুবতীকে এআই-ভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি নতুন আইটিআই এবং নতুন সরকারি আইন মহাবিদ্যালয় স্থাপনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
খেলাধুলা
যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দফতরের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৫১ কোটি টাকা। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি অলিম্পিক বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য ৪২ কোটি এবং খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তার জন্য ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সামাজিক ন্যায় ও আবাসন
সামাজিক ন্যায় দফতরের জন্য বরাদ্দ ৩ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। আয়োথিদাস পণ্ডিতার আবাসন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ৩০০ কোটি টাকা। কাঁচা বাড়ি পাকা করার প্রকল্পে সরকারি অনুদান ৩ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৭০ হাজার বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হবে।
পর্যটনে নতুন উদ্যোগ
মামল্লপুরমকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রের কাছে ২০০ কোটি টাকার সহায়তা চাওয়া হবে। কাবেরী, বৈগাই ও তামিরাপারানি নদীতে নদীভিত্তিক পর্যটনের জন্য ৫৩ কোটি টাকা, ফুড ট্যুরিজম ও শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে ২০ কোটি টাকা এবং ইকো-ট্যুরিজম ও জনজাতি-স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার উন্নয়নে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি দফতরের মোট বরাদ্দ ৭৭৭ কোটি টাকা।
পরিকাঠামো ও বিচারব্যবস্থা
চেন্নাইয়ের ব্রডওয়েতে ১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সমন্বিত আদালত কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। বিচার দফতরের জন্য বরাদ্দ ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।
দুর্যোগ মোকাবিলা
সম্ভাব্য সুপার এল-নিনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা এবং রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের জন্য ১১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা
স্বরাষ্ট্র, মদ্যনিষেধ ও আবগারি দফতরের জন্য বরাদ্দ ১৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। ‘সিঙ্গাপ্পেন স্পেশাল ফোর্স’-এর জন্য ৩৫৪ কোটি, মাদকবিরোধী পদক্ষেপে ৭০ কোটি এবং পুলিশ আবাসন নির্মাণে ৪৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান
নতুন কর্মসংস্থান প্রকল্পে ১২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। শহরসংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ‘নেইথাল পুনরুদ্ধার’ প্রকল্পে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন দফতরের মোট বরাদ্দ ৩৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা।
বাজেটের উল্লেখযোগ্য দিক:
মোট সম্ভাব্য আয় ৩.৫০ লক্ষ কোটি টাকা, রাজস্ব ঘাটতি ৫৫ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।
রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ১০.৯৮ লক্ষ কোটি টাকা হতে পারে।
সব মহিলার জন্য ৮ গ্রাম সোনার মুদ্রা ও রেশমি শাড়ি।
মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জন্য ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ।
স্কুলশিক্ষায় ৪৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, পড়ুয়াদের ল্যাপটপ বিতরণ।
৫ লক্ষ যুবক-যুবতীর এআই প্রশিক্ষণ।
১০ হাজার সরকারি স্কুলে ‘সুপার ক্লিন, সুপার ক্যাম্পাস’।
মামল্লপুরমকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
গ্রামীণ উন্নয়নে ৩৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, কর্মসংস্থান প্রকল্পে ১২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।
চেন্নাইয়ে ১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার সমন্বিত আদালত কমপ্লেক্স।
কাঁচা বাড়ি পাকা করতে অনুদান ৫ লক্ষ টাকা।
১০টি অলিম্পিক বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
সুপার এল-নিনো মোকাবিলায় ৩৪০ কোটি টাকা।
স্বরাষ্ট্র দফতরে ১৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, পুলিশ আবাসন ও মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব।
শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়, কর্মসংস্থান ও সুশাসনকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের মূল অগ্রাধিকার করেছে টিভিকে সরকার।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য