আর্থিক প্রলোভনে নাবালকদের রক্তদান, দুর্গাপুরে পুলিশের জালে ‘রক্তচোষা’ সিন্ডিকেট; তৃণমূল ছাত্রনেতাসহ ধৃত ৩, প্রশ্নের মুখে হাসপাতালের ভূমিকা
দুর্গাপুর, ৭ আগস্ট (হি. স.): আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নাবালক স্কুলপড়ুয়াদের দিয়ে রক্তদান করানোর অভিযোগে দুর্গাপুরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের এক নেতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আরও এক অভিযুক্তের খোঁজ চলছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্
আর্থিক প্রলোভনে নাবালকদের রক্তদান, দুর্গাপুরে পুলিশের জালে ‘রক্তচোষা’ সিন্ডিকেট; তৃণমূল ছাত্রনেতাসহ ধৃত ৩, প্রশ্নের মুখে হাসপাতালের ভূমিকা


দুর্গাপুর, ৭ আগস্ট (হি. স.): আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নাবালক স্কুলপড়ুয়াদের দিয়ে রক্তদান করানোর অভিযোগে দুর্গাপুরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের এক নেতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আরও এক অভিযুক্তের খোঁজ চলছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নাবালকদের দিয়ে বেআইনিভাবে রক্ত সংগ্রহ করছিল। এই ঘটনায় বেসরকারি হাসপাতালের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিজেপি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান সংগঠন।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের নাম অমিত প্রসাদ যাদব, দুর্গাপুরের মুচিপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা; দেবপ্রিয় চক্রবর্তী, দুর্গাপুর এ-জোনের বাসিন্দা ও দুর্গাপুর সরকারি মহাবিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র; এবং মহম্মদ হাবিবুল্লাহ, মালদার বাসিন্দা, বর্তমানে দুর্গাপুরের বিধাননগরে একটি বেসরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন হোটেলের কর্মী।

শুক্রবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের জামিনের আবেদন খারিজ করে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।

অভিযোগ, আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের নাবালক ছাত্রদের বিধাননগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে রক্তদান করানো হত। রক্তদানের পর প্রত্যেককে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দেওয়া হত। এমনকি বয়স গোপন করতে আধার কার্ডে জন্মতারিখ পরিবর্তনেরও অভিযোগ উঠেছে। এক ছাত্র জানিয়েছে, তিন মাসের মধ্যে তার দু'বার রক্ত নেওয়া হয়েছে।

ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই কয়েকজন অভিভাবক দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে দুর্গাপুর থানার পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতর। তদন্তে প্রথমেই উঠে আসে ওই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র তথা বর্তমানে দুর্গাপুর সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর নাম। অভিযোগ, সে-ই বিভিন্ন আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নাবালক ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যেত।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দেবপ্রিয় দাবি করে, তাকে এই কাজে যুক্ত করেছিলেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা অমিত প্রসাদ যাদব। তদন্তে আরও উঠে আসে মহম্মদ হাবিবুল্লাহর নাম। বর্তমানে তিনি বিধাননগরের একটি বেসরকারি হোটেলে কর্মরত। পুলিশের দাবি, গোটা চক্রটি পরিচালনা করতেন অমিত প্রসাদ যাদব। দেবপ্রিয়র অভিযোগ, অমিত তাকে বলেছিল যত বেশি রক্তদাতা জোগাড় করা যাবে, তত বেশি অর্থ মিলবে। সেই লোভেই সে নাবালক ছাত্রদের এই চক্রে জড়িয়ে ফেলে।

বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তী, মহম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং অমিত প্রসাদ যাদবকে গ্রেফতার করে দুর্গাপুর থানার পুলিশ। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না বা এর পেছনে বড় কোনও নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, গোটা ঘটনায় বেসরকারি হাসপাতালের ভূমিকা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। ১৮ বছরের কম বয়সি ছাত্রদের কীভাবে রক্তদান করতে দেওয়া হল? নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়সি সুস্থ ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে রক্তদান করতে পারেন। সেখানে একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের তিন মাসের মধ্যে দু'বার রক্ত নেওয়া হল কীভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দুর্গাপুর ব্লাড ডোনার্স কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সজল বোস বলেন, “আমরা বহুদিন ধরেই কিছু বেসরকারি হাসপাতালের রক্ত সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। অভিযোগও জানিয়েছি। অনেক হাসপাতাল সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত না নিয়ে রোগীর পরিবারকে রক্তদাতা আনতে বাধ্য করে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছি।”

ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্তে বিধাননগরের ওই বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের একটি প্রতিনিধি দল। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কের নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয়েছে। সমস্ত তথ্য যাচাই করে স্বাস্থ্য দফতরে রিপোর্ট পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে প্রতিনিধি দল।

যে স্কুলের ছাত্ররা রক্তদান করেছে, সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী বোস বলেন, “এই চক্রের জাল অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। শুধু আমাদের স্কুল নয়, তদন্ত হলে দেখা যাবে দুর্গাপুরের আরও বহু স্কুলের ছাত্র এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।”

এদিন খবর পেয়ে আদালতে আসেন হাবিবুল্লাহর স্ত্রী দিলরুবা খাতুন। তিনি বলেন, “আগে কাপড়ের ব্যবসা করতাম। লোকসান হওয়ায় প্রায় ন'মাস আগে আমার স্বামী হোটেলে কাজ নেন। কেউ রক্তদাতা প্রয়োজন হলে জানাতে বলেছিল, তাই জানিয়েছিল। ও খুব পরোপকারী মানুষ, এর বেশি কিছু জানে না।”

দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ ঘড়ুই বলেন, “রক্ত নিয়ে যদি কেউ ব্যবসা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সে যে দলেরই হোক না কেন। ঘটনার তদন্ত চলছে, দোষীরা শাস্তি পাবে।”

ডিসি (পূর্ব) রসপ্রীত সিং জানান, “ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা




 

 rajesh pande