

কোকরাঝাড় (অসম), ২০ জানুয়ারি (হি.স.) : জনৈক যুবককে নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কোকরাঝাড় জেলায় চরম অশান্তি বিরাজ করছে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করেছে বিভিন্ন এলাকায়। জায়গায় জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ-প্রতিবাদের জেরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুল নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে প্রশাসন। নামানো হয়েছে রেপিড অ্যাকশন ফোর্স। ইতিমধ্যে দু-এক জায়গায় সহিংস-বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং শূন্যে গুলি ছুঁড়েছে। পরিস্থিতির যাতে আরও অবনতি না হয়, তার জন্য গোটা জেলায় সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা।
ঘটনার সূত্রপাত গতকাল সোমবার সন্ধ্যায়। গতকাল সংগঠিত নির্মম গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দুই। নিহত দুই যুবকের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, তাঁরা সিখনা জৌহৌলাউ বিস্মিত ওরফে রাজা বিস্মিত এবং সুনীল মুর্মু। ওই ঘটনায় আহত আরও তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সিখনা জৌহৌলাউ বিস্মিতের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রতিবাদী বিক্ষোভ শুরু হয়। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ সহিংসতার পর্যায়ে ছড়ায়। সহিংস সংঘৰ্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ছুঁড়তে থাকে পাথর। পাথরের ঘায়ে জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মীও। আহত সবাইকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়কের কারিগাঁও এলাকায়। কারিগাঁও পুলিশ ফাঁড়ির সামনে বিক্ষোভকারীরা জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করে। এতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা একটি নিৰ্মাণকারী সংস্থার শিবির, বীরসা কমান্ডো ফোর্সের দুটি অস্থায়ী শিবির, নিৰ্মীয়মাণ আদিবাসী সাংস্কৃতিক প্ৰকল্প সিদু কানহু ভবনকে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। ভাঙচুর চালানো হয়েছে একাধিক সম্পত্তিতে। বেশ কয়েকটি দোকানেও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। দু-একটি গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এক কথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
এ খবর লেখা পর্যন্ত এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়েছে। নামানো হয়েছে রেপিড অ্যাকশন ফোর্স। তারা জায়গায় জায়গায় টহল দিচ্ছে।
জেলার সাধারণ ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। সহিংসতা যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতি সক্রিয় রাখা হয়েছে। কর্তন করা হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গতকাল সোমবার গৌরনগরে সংগঠিত এক মর্মান্তিক ঘটনার পর এই অশান্তির সূত্রপাত। কোকরাঝাড়ের কারিগাঁও পুলিশ ফাড়ি থেকে এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গৌরীনগরের মাসিংরোড এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় সংঘটিত এক সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মরান্দা বসুমতারি নামের এক ঠিকাদার মাসিংরোড এলাকায় একটি রাস্তা নির্মাণের কাজে যুক্ত।
গতকাল (সোমবার) ঠিকাদার মরান্দা বসুমতারির জামাতা সিখনা জৌহৌলাউ বিস্মিত ওরফে রাজা বিস্মিত, রোলার চালক প্রভাত ব্রহ্ম, যোগীরাজ ব্রহ্ম সহ মোট পাঁচজন মাসিংরোড এলাকায় বেলচা আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরার পথে সংঘটিত একটি সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ কতিপয়ের সঙ্গে প্রথমে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। কথা কাটাকাটি মারপিটে পরিণত হলে উত্তেজিত জনতার গণপ্রহারে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু বরণ করেন সিখনা জৌহৌলাউ বিস্মিত। জনতার পিটুনিতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন নির্মাণ সংস্থার অন্য চারজনও। তারা নির্মাণ সংস্থার স্করপিও গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, আজ মঙ্গলবার সকালে কোকরাঝাড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সুনীল মুর্মু নামের আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস