উত্তরপূর্ব ভারতে বিজেপির মহীরূহ, আদর্শিক রাজনীতির অগ্রদূত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি
গুয়াহাটি, ৭ জানুয়ারি (হি.স.) : ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা, উত্তরপূর্ব ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির অগ্রদূত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের প্রয়াণে এক স্মরণীয় যুগের অবসান ঘটেছে। কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে শুধু একজন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা কয়কবারে
কবীন্দ্র পুরকায়স্থের বিশেষ কয়েকটি ছবি


গুয়াহাটি, ৭ জানুয়ারি (হি.স.) : ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা, উত্তরপূর্ব ভারতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির অগ্রদূত কবীন্দ্র পুরকায়স্থের প্রয়াণে এক স্মরণীয় যুগের অবসান ঘটেছে। কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে শুধু একজন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা কয়কবারের সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, উত্তরপূর্ব ভারতে বিজেপির উত্থানের প্রধান দিকনির্দেশক হিসেবে স্মরণ করা হবে। তিনি একজন এমন নেতা, যাঁর অনুশাসিত জীবনশৈলী, দৃঢ়তা, আদর্শিক স্পষ্টতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা অসম সহ বহিঃরাজ্যেও প্রজন্মের পর প্রজন্মের রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।

১৯৩১ সালের ১৫ ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ)-এর সিলেট জেলার কামারখালে জন্মগ্রহণ করেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ। পরবর্তীতে সিলেট এবং অসমের কাছাড় জেলা সদর শিলচরে স্কুল ও কলেজের পাঠ সমাপ্ত করে গৌহাটি ইউনিভার্সিটি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (এমএ) এবং বিটি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

কবীন্দ্র পুরকায়স্থের রাজনৈতিক জীবনের শিকড় ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে। ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন সাধারণ স্বয়ংসেবক থেকে ১৯৫৩ সালে সংঘের পূর্ণকালীন (অলিখিত প্রচারক) কার্যকর্তার দ্বায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই সময়কালে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আদর্শ বিস্তার তথা কার্যকর্তা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

ইত্যবসরে ১৯৭০ সালে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে পা রাখেন। কর্মজীবন শুরু করেন শিলচর নরসিং হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। এর পর ১৯৭৪ ইংরেজিতে অধুনা শ্রীভূমি জেলার অন্তর্গত রামকৃষ্ণনগরে অবস্থিত রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

পরবর্তীতে সংঘের নির্দেশে সক্রিয় রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখেন কবীন্দ্র পুরকায়স্থ। ১৯৭৮ সালে শিলচর বিধানসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৮০ সালে জনসংঘ থেকে গঠন হয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ওই সালে তদানীন্তন বোম্বাই (অধুনা মুম্বাই)-এ বিজেপির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অংশগ্ৰহণ করেছিলেন তিনি। ওই অধিবেশনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয় কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে। তবে রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখলেও আমৃত্যু তিনি ছিলেন একজন স্বয়ংসেবক।

এর পর সব ইতিহাস। যখন বিজেপির পতাকা ধরার জন্য কেউ ছিলেন না, তখন তিনি একা দৃঢ়তার সঙ্গে, অসম্ভব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে দলের উত্থান ঘটাতে থাকেন। ধীরে ধীরে দল বড় হতে থাকে তাঁর হাত ধরে। এ ভাবে এই অঞ্চলে দলের প্রধান রূপকারে পরিণত হন জনপ্রিয় অশীতিপর নেতা কবীন্দ্র পুরকায়স্থ।

অসম বিজেপির পিতামহ হিসেবে পরিচিত কবীন্দ্র পুরকায়স্থ ছিলেন সেই সব প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম, যাঁরা এই অঞ্চলে দলের আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তিনি দলের অন্যতম শ্রদ্ধেয় প্রবীণ নেতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসেন। বাৰ্ধক্যজনিত কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পরও বহু শীর্ষ বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী তাঁর পরামর্শ ও প্রজ্ঞার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন।

১৯৯১ সালে কবীন্দ্র পুরকায়স্থ বিজেপির টিকিটে অসমের প্রথম সাংসদ হিসেবে শিলচর আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পর ১৯৯৮ সালে ফের নিৰ্বাচিত হয়েছিলেন শিলচর কেন্দ্ৰ থেকে। ২০০৯ সালে তিনি আবারও লোকসভায় প্রত্যাবর্তন করেন দুর্দণ্ডপ্রতাপ কংগ্রেস নেতা সন্তোষমোহন দেব এবং এআইইউডিএফ-প্রধান বদরউদ্দিন আজমলের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে।

সমাজজীবনে তাঁর আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের একবিংশ সমাবর্তনে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয় কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে। সম্মানসূচক ডক্টরেট একটি বিরল সম্মান, যা অসম ও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পরিবারেও অব্যাহত রয়েছে। তাঁর একমাত্ৰ ছেলে কণাদ পুরকায়স্থ ২০২৫ সালে অসম থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande