আইডিএফএ-তে স্থান 'রিভার্স অব মেমোরি'-র, তথ্যচিত্রের মুহূর্তবন্দি বঙ্গসন্তান নবনীলের হাত ধরে
সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী কলকাতা, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): যে জনপদ একসময়ে মুখরিত হতো কলতানে, আজ সেখানে যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা| যে প্রকৃতি সমৃদ্ধ করেছিল, রসদ জুগিয়েছিল সমাজ গঠনে, এখন সেখানেই বিরাজ করছে ধ্বংসলীলা| ওড়িশার যে উপকূল বরাবর বসতি গড়ে উঠেছিল সাত

রিভার্স অব মেমোরি ও সিনেমাটোগ্রাফার নবনীল সান্যাল

 
সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী

কলকাতা, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): যে জনপদ একসময়ে মুখরিত হতো কলতানে, আজ সেখানে যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা| যে প্রকৃতি সমৃদ্ধ করেছিল, রসদ জুগিয়েছিল সমাজ গঠনে, এখন সেখানেই বিরাজ করছে ধ্বংসলীলা| ওড়িশার যে উপকূল বরাবর বসতি গড়ে উঠেছিল সাতটি গ্রাম মিলে, আজ তার অনেকাংশই তলিয়েছে সমুদ্রের গর্ভে| সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু তো জনপদ নয়, একইসঙ্গে গ্রাস করেছে জীবনধারণের অবলম্বনগুলোও| একদিকে জলস্তর বৃদ্ধি, ক্ষয়িষ্ণু উপকূল; অন্যদিকে খরা- এই চরম বৈপরীত্য নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে শিশির ঝা-র 'রিভার্স অব মেমোরি' তথ্যচিত্রে| ক্যামেরার নিপুণ ফ্রেমে সেই মুহূর্তগুলিকে ধরেছেন বঙ্গসন্তান সিনেমাটোগ্রাফার নবনীল সান্যাল| আর সেটাই ‘ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আমস্টারডাম’ (আইডিএফএ)-তে জায়গা করে নিয়েছে|

৭২ মিনিটের এই তথ্যচিত্র আইডিএফএ-র ৩৯-তম সংস্করণের 'এনভিশন কম্পিটিশন'-এ তালিকাভুক্ত ১৩টি চলচ্চিত্রের অন্যতম। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক এই তথ্যচিত্র উৎসব আগামী ১২ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত হবে। কিউবা, বেলজিয়াম, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, হংকং-সহ বিভিন্ন দেশের তথ্যচিত্রের পাশাপাশি ভারতীয় এই তথ্যচিত্রও নির্বাচিত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় এমন কিছু তথ্যচিত্র স্থান পেয়েছে যেখানে গল্প বলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেলুলয়েডের নান্দনিক রূপ ও মাধ্যম। এখানে চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁদের বিষয়বস্তুর ওপর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ এবং বর্ণনার কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।আইডিএফএ তাদের ২০২৬ সালের এই সংস্করণে বিশ্বজুড়ে ২৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র এবং নিউ-মিডিয়া প্রজেক্ট প্রদর্শন করবে।

হিন্দুস্থান সমাচারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সিনেমাটোগ্রাফার নবনীল সান্যাল বলেন, এই তথ্যচিত্র উপস্থাপন করছেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ| নবনীল বাবু এও জানান, 'এনভিশন কম্পিটিশন' বিভাগ সবচেয়ে কঠিন| এবছর প্রায় চার হাজার চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল এই বিভাগে| এর আগে মাত্র চারটি ভারতীয় চলচ্চিত্র জায়গা পেয়েছিল এই প্রতিযোগিতায়| ভারত থেকে 'রিভার্স অব মেমোরি' সেই তালিকায় যুক্ত হলো পঞ্চম তথ্যচিত্র হিসেবে|

লেকটাউনের বাসিন্দা নবনীল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করলেও ঝোঁক ছিল সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে| সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (এসআরএফটিআই) থেকে অধ্যয়ন করে পুরোদস্তুর নামেন চলচ্চিত্র নির্মাণে| আগেও যুক্ত থেকেছেন একাধিক সিনেমাটোগ্রাফির কাজে| 'রিভার্স অব মেমোরি' এনে দিলো বড় সাফল্য|

'রিভার্স অব মেমোরি'-র কাহিনি আবর্তিত হয়েছে নদীকেন্দ্রিক জীবনকে ঘিরে| প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেখানে সব ওলটপালট করে দেয়| ফসলহানি, দুর্নীতি এবং ভিটেমাটি হারানোর ভয় দুর্বিষহ করে তোলে দৈনন্দিন জীবন| সেসময়ই রেডিওতে ভেসে আসে আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের দুঃসংবাদ। এ এমন এক স্থান, যেখানে সামান্য পানীয় জলের জন্যও বাসিন্দাদের পেরোতে হয় কয়েক কিলোমিটার পথ। তরুণরা তাদের ভবিষ্যতের সন্ধানে পাড়ি জমায় অন্য শহরে| আর যারা থেকে যায়, তারা বেড়ে ওঠে একাকীত্বের মধ্যে। প্রবীণরা বসে থাকেন তাঁদের ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া সন্তান এবং হারিয়ে যাওয়া এককালের সমৃদ্ধ জনপদের স্মৃতি আঁকড়ে।

প্রকৃতির মর্মস্পর্শী শব্দ, আর্কাইভের পুরোনো ফুটেজ এবং বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর তথ্যচিত্রে যোগ্য সঙ্গত করেছে একসময়ের সমৃদ্ধ নদীকেন্দ্রিক জীবনের বিলুপ্তিকে ফুটিয়ে তুলতে। তথ্যচিত্রে বহমান নদীটি আদতে স্মৃতির প্রবাহ| একইসঙ্গে তা হয়ে উঠেছে অভিবাসন ও হারানোর বেদনা এবং একটু একটু করে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়া এক ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রতীক।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আমস্টারডাম’ (আইডিএফএ)| ক্রমে তা আজ তথ্যচিত্র নির্মাতাদের প্রধান আন্তর্জাতিক মঞ্চ হয়ে উঠেছে|

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ




 

 rajesh pande