চার দশকে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তর-পূর্বের অন্যতম জ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ার আহ্বান মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহার
আগরতলা, ২ অক্টোবর (হি.স.) : সীমিত সংখ্যক বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় চার দশকের পথ অতিক্রম করে আজ রাজ্যের শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে উত্তর-পূর্ব ভার
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন


আগরতলা, ২ অক্টোবর (হি.স.) : সীমিত সংখ্যক বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় চার দশকের পথ অতিক্রম করে আজ রাজ্যের শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে উত্তর-পূর্ব ভারতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুক্রবার ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহারাজা বীর বিক্রম শতবার্ষিকী ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।

অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী কিশোর বর্মণকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান ও সাফল্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, অ্যাসোসিয়েট অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি মেম্বার-সহ টিচিং ও নন-টিচিং স্টাফদেরও সম্মাননা প্রদান করা হয়।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দশকের যাত্রা রাজ্যের উচ্চশিক্ষার বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৮৭ সালের ২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। চার দশকের সাফল্যকে স্মরণ করার পাশাপাশি আগামী চার দশকের জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মানিক সাহা বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্যোগপতি তৈরির উদ্যোগ এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার প্রসারের মাধ্যমে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়কে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান জ্ঞান ও উদ্ভাবন কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। ত্রিপুরার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় জাতি-জনজাতি সমাজ, জীববৈচিত্র্য এবং অনন্য ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য গবেষণার ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। এই সম্ভাবনাগুলিকে কাজে লাগিয়ে গবেষণার পরিধি আরও বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, শিক্ষা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠন, দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি সেবার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া নয়, অর্জিত জ্ঞানকে সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করাও অন্যতম দায়িত্ব। শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, উদ্ভাবন, উদ্যোগপতি তৈরি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে শিক্ষাগত সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

রাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০১৮ সাল থেকে রাজ্যে সাতটি নতুন সরকারি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পুরাতন আগরতলা, পানিসাগর, আমবাসা, কাকড়াবন ও করবুকের পাশাপাশি নলছড় সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজ এবং শ্রী অরবিন্দ জেনারেল ডিগ্রি কলেজ (ইংরেজি মাধ্যম) এই তালিকায় রয়েছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নলছড় সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজে পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। আগরতলার মহিলা কলেজকে ত্রিপুরা সরকারি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে রাজ্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে আইন পাস করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত এক বছরে মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ বৃত্তি প্রকল্পের আওতায় উচ্চশিক্ষার জন্য ২০ জন দিব্যাঙ্গ, বিশেষত দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, বিশেষ করে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ‘লক্ষ্য-চিফ মিনিস্টারস স্পেশাল স্কলারশিপ’ প্রকল্পে গত এক বছরে আরও দু’জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পে মোট উপকৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ জন।

মুখ্যমন্ত্রী কন্যা আত্মনির্ভর যোজনার মাধ্যমে মেধাবী ছাত্রীদের বিনামূল্যে স্কুটি প্রদান করা হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পে প্রায় ১৪০ জন ছাত্রী উপকৃত হয়েছেন। সরকারি ডিগ্রি কলেজগুলিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ৭৪ জন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের জন্য টিপিএসসি সুপারিশ করেছে। আরও ১২৬টি পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি পাঁচজন অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়েছে এবং আরও ২০০টি সহকারী অধ্যাপকের পদ সৃষ্টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আগরতলা, উদয়পুর ও আমবাসায় তিনটি ত্রিপুরা কম্পিটিটিভ এক্সামিনেশন সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজ্যের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জাতীয় শিক্ষানীতি চালু হয়েছে। বহুমুখী শিক্ষা পাঠ্যক্রম, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কুঞ্জবনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন এডুকেশন এবং কুমারঘাটের কলেজ অব টিচারস এডুকেশনে সাধারণ ডিগ্রি কোর্স চালু করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কুঞ্জবনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন এডুকেশনে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি কোর্স চালু করা হচ্ছে।

উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। এমবিবি কলেজ, উদয়পুরের নেতাজি সুভাষ মহাবিদ্যালয়, ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটিতে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ চলছে বলে জানান তিনি। রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শ্রেণিকক্ষ, স্মার্ট ক্লাসরুম, গবেষণাগার ও ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজও চলছে। প্রধানমন্ত্রী উচ্চতর শিক্ষা অভিযান বা পিএম-উষা প্রকল্পের আওতায় একাধিক সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এসএএসসিআই প্রকল্পের আওতায় বিলোনীয়ার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলেজে অ্যাকাডেমিক ভবন, করবুক সরকারি ডিগ্রি কলেজে অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক ও গ্রন্থাগার ভবন এবং আগরতলার রামঠাকুর কলেজে অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়া এমবিবি কলেজে এক হাজার আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এই বিনিয়োগ শুধুমাত্র পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য নয়, রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং নতুন কর্মসংস্থান কাঠামোর কারণে শিক্ষা ও কর্মজগতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন হলেও শিক্ষার মৌলিক মূল্যবোধ অপরিবর্তিত থাকবে। তাই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্র—এই তিনটি বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সফল কর্মজীবন নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক ও সহমর্মী মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। নিজের, পরিবারের, রাজ্যের এবং দেশের জন্য স্বপ্ন দেখার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী কিশোর বর্মণ ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের মানুষের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীদের শুধু ডিগ্রি দেয় না, ভবিষ্যৎ গড়ার দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে, যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ হতে শেখানোর প্রয়োজন রয়েছে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নে একাগ্রচিত্তে কাজ করবেন।

প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, দেবী অহল্যা বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধন ব্যাঙ্ক এবং পল্লী ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন-সহ মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতাপত্র বা মউ স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আহমদ জাভেদ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রাজীব মোহন পন্থ, ইন্দোরের দেবী অহল্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রাকেশ সিংহাই, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক দেবব্রত দাস, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সমীর কুমার শীল এবং বন্ধন ব্যাঙ্কের এমডি চন্দ্রশেখর ঘোষ। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আধিকারিক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।

হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ




 

 rajesh pande