
আগরতলা, ২৫ অক্টোবর (হি.স.) : রাজ্যজুড়ে যখন কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আনন্দ ও আয়োজন, ঠিক তখনই রাজধানী আগরতলার বনকুমারীর আদর্শ কলোনি এলাকায় জনৈক তরুণী গৃহবধূর অকালমৃত্যুকে কেন্দ্র করে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পূর্ব আগরতলা থানাধীন বনকুমারি আদর্শ কলোনি চাঁনমারি এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে রবিবার সকালে উদ্ধার হয়েছে ২১ বছর বয়সি সুস্মিতা ঘোষের ঝুলন্ত মৃতদেহ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। সুস্মিতার বাবার সরাসরি অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের তির সুস্মিতার স্বামী বিশ্বজিৎ বর্মন এবং তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ির দিকে। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে ভালোবাসার টানে বিশ্বজিৎ বর্মনের হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে বিয়ে করেছিলেন সুস্মিতা ঘোষ। পরিবারের তরফে অন্যত্র তাঁর বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। এমনকি বিয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাড়িতে আশীর্বাদের অনুষ্ঠানও চলছিল বলে দাবি সুস্মিতার বাবার। সেই সময়ই বিশ্বজিৎ-এর সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন সুস্মিতা। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সেই দাম্পত্য জীবন ক্রমশ তাঁর কাছে যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছিল।
সুস্মিতার বাবার অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মেয়েকে নানা ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, জামাতা মাদকাসক্ত এবং তাঁর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সুস্মিতার প্রতি দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। রবিবার সকালে মেয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে সুস্মিতার মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
পরিবারের আরও অভিযোগ, সুস্মিতার ছোট্ট সন্তান থাকা সত্ত্বেও তাঁর উপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এমনকি সন্তানকে দূরে সরিয়ে রেখে স্বামী ও শাশুড়ি মিলে তাঁকে খুন করেছেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন সুস্মিতার বাবা। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তদন্তের পরই এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, বিশ্বজিৎ বর্মন মাদকাসক্ত হওয়ার পাশাপাশি জুয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, জুয়ার আসর থেকে বাড়ি ফিরে প্রায়ই সুস্মিতার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। এমনকি ছোট শিশুটির সামনেও মায়ের উপর অত্যাচার চলত বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেশী ও বাপের বাড়ির আত্মীয়দের কাছে সুস্মিতা একাধিকবার নিজের দুর্দশার কথা জানিয়েছিলেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ, ভালোবেসে বিয়ে করার কারণে সুস্মিতাকে বারবার সংসারে ফিরে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। আত্মীয়-পরিজনদের বোঝানোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শ্বশুরবাড়িতেই থেকে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য। পারিবারিক অশান্তি, নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে।
ঘটনার খবর পেয়ে পূর্ব আগরতলা মহিলা থানার পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখান থেকে সুস্মিতার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দলকেও ডাকা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য খতিয়ে দেখার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পরিবারের তরফে ওঠা পরিকল্পিত খুনের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে এলাকাবাসীর।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে যখন ঘরে ঘরে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় ব্যস্ত মানুষ, তখনই একটি পরিবারের গৃহবধূর এমন মর্মান্তিক পরিণতি গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি করেছে বনকুমারীর আদর্শ কলোনিতে। একদিকে মাতৃহারা ছোট্ট শিশু, অন্যদিকে মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে শোকস্তব্ধ সুস্মিতার পরিবার। তবে আবেগ ও অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণই এখন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ