
আগরতলা, ৩ অক্টোবর (হি.স.) : আগরতলা শহর-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তিক শহরাঞ্চলকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকভাবে গড়ে তুলতে সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। শুধুমাত্র রাস্তা, নিকাশি ব্যবস্থা কিংবা দালানকোঠা নির্মাণই নয়, নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং শহরের সার্বিক উন্নয়নই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। শনিবার উজান অভয়নগর বাজার সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী পুকুরের সার্বিক সংস্কার, আধুনিকীকরণ ও সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাব, অবহেলা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে আগরতলা শহর-সহ রাজ্যের বহু ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও জলাশয় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। জলাশয় ভরাটের ফলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে বর্ষাকালে জলনিকাশি ব্যবস্থাতেও নানা সমস্যা দেখা দিত। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগরতলা পুর নিগম এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির যৌথ উদ্যোগে শহরের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়গুলি চিহ্নিত করে সেগুলিকে পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উজান অভয়নগর বাজার সংলগ্ন পুকুরটির সৌন্দর্যায়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অমৃত প্রকল্পের আওতায় জলাশয়টির চারপাশ বাঁধানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, বসার জায়গা এবং সুন্দর সবুজ বাগান। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাজারে আসা সাধারণ মানুষের প্রাতঃভ্রমণ ও বৈকালিক বিশ্রামের জন্য একটি মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে এলাকার সামগ্রিক সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে ত্রিপুরায় নগরায়ণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আগরতলা শহরকে আরও স্মার্ট, আধুনিক ও বাসযোগ্য করে তুলতে নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, যানজট নিরসনে বিকল্প সড়ক নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ ও স্ট্রিট লাইট স্থাপন, পার্ক ও জলাশয় সংরক্ষণ-সহ একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। শুধু আগরতলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা সদর, পুর পরিষদ ও নগর পঞ্চায়েত এলাকাতেও একইভাবে উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে চলেছে।
নাগরিকদের দায়িত্বের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প তৈরি করে জনগণের সেবায় উৎসর্গ করছে। কিন্তু সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা এবং সেগুলিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। পুকুরের জল কিংবা জলাশয়ের চারপাশে প্লাস্টিক, থার্মোকল বা অন্যান্য আবর্জনা না ফেলার জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি ও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সকলের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের অমৃত প্রকল্পের আওতায় তিন কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে উজান অভয়নগর বাজার সংলগ্ন পুকুরটির সংস্কার, পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অবৈধ দখল, আবর্জনা ও পরিবেশ দূষণের সমস্যায় জর্জরিত এই জলাশয়কে স্থানীয় কর্পোরেটরের উদ্যোগ এবং মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতায় আধুনিক ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
মেয়র বলেন, ২০২১ সালে বর্তমান পুরনিগম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় আগরতলা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে রাস্তা, নিকাশি, ড্রেন, স্ট্রিট লাইট এবং পরিত্যক্ত পার্ক ও জলাশয় সংস্কারের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নাগরিক পরিষেবা আরও সহজলভ্য করতে ওয়ার্ড অফিসগুলিকেও সক্রিয় করা হয়েছে।
আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে শহরের রাস্তাঘাট সংস্কার, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মেয়র। শহরকে পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখতে নাগরিক, স্থানীয় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘মুখ্যমন্ত্রী পরিচ্ছন্নতা পুরস্কার’-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মেয়র আরও জানান, আগরতলা শহরের প্রায় ২৪-২৫টি পুরনো জলাশয় ও পার্ককে পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধার করে পর্যটন ও বিনোদনের উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ চলছে। এর ফলে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত বিনোদন ও অবসরযাপনের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর তিনি উপস্থিত অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে নবসজ্জিত জলাশয়টি পরিদর্শন করেন। পুকুরের চারপাশের উন্নয়নকাজ, হাঁটার পথ, সবুজায়ন এবং নাগরিকদের জন্য তৈরি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘুরে দেখেন তিনি। অনুষ্ঠানে উজান অভয়নগর বাজার পুকুরের সার্বিক সংস্কার ও সৌন্দর্যায়ন নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আগরতলা পুর নিগমের অতিরিক্ত কমিশনার মিহির কান্তি গোপ। উপস্থিত ছিলেন পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র মনিকা দাস দত্ত, কর্পোরেটর হীরালাল দেবনাথ, প্রণীশ চন্দ, কমিশনার সাজু ওয়াহিদ এ-সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও পুরনিগমের আধিকারিকরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ