
দুর্গাপুর, ৯ অক্টোবর (হি. স.): ছুপড়ি ঘরেই গড়ে উঠেছে আস্ত এক একটা তেলের ডিপো। অগ্নির্বাপক আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জ্বালানি তেলের মজুত। সড়কের পাশে বনভূমি দখল করে রমরমিয়ে চলছে চোরাই তেলের কারবার। তার জেরেই বিপন্ন সবুজ অরোণ্য। তেমনই চোরাই ঠেকে চলছে অসামাজিক কার্জকর্ম তার জেরে আতঙ্কিত পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসীরা। দুর্ঘটনা ঘটলেও টনক নড়েনি দমকল বিভাগের। এমনই ছবি ধরা পড়ল কাঁকসার রাজবাঁধ, বিলপাড়া, চারের মাইলে। প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ ও এক্সপ্লোসিভ বিভাগের নজরদারিতে। অভিযোগ, একশ্রেণীর আধিকারিকদের মদতেই চলছে এসব চোরাই তেল কাটিংয়ের রমরমা কারবার।
প্রসঙ্গত, বছরখানেক আগেই কাঁকসার বীরুডিহা বায়ুসেনা ঘাঁটি লাগোয়া অবৈধ তেল ডিপোয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তার আগে ২০২২ সালে মার্চ মাসে বিরুডিহায় পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জ্বালানী তেলের ট্যাঙ্কারে আগুন লাগে। তাতে বেশ কয়েকজন ঝলসে যায়। এছাড়াও ২০১৮ সালে অবৈধভাবে তেল মজুতের গ্যারেজে আগুন লেগে একজনের মৃত্যু হয়। তারপরও হুঁশ ফেরেনি। অগ্নি নির্বাপক ও বিস্ফোরক বিভাগের অনুমতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে হাজার হাজার লিটার চোরাই জ্বালানি তেল মজুত করে বিক্রির রমরমা কারবার চলছে। ১৯ নং জাতীয় সড়কের ওপর রাজবাঁধে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়ামের তেল ডিপো। ট্যাঙ্কার থেকে জ্বালানি তেল চুরি ঠেকাতে সম্প্রতি ই-লকিং সিস্টেম চালু করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। তাতে ডিপো থেকে ট্যাঙ্কারে জ্বালানি তেল ভর্তির পর নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ডে লকিং করা হয়। ট্যাঙ্কারগুলিতে জিএসপিএস মনিটারিং সিস্টেম রাখা হয়। যাতে তেলসংস্থার ডিপো থেকে নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত রুট লকিং থাকে। তার বাইরে অন্য রুটে ট্যাঙ্কার চালনা হলে, মুহুর্তে জানান দেবে তেল সংস্থার অফিসে। এছাড়াও, ট্যাঙ্কারে ই-লকিং একমাত্র ডিপো ও নির্ধারিত পেট্রোলপাম্পে খুলবে। সেখানে লকিং সুইচ দেওয়া মাত্রই পাম্প মালিকের রেজিস্টার করা মোবাইল নম্বরে ওটিপি যাবে। সেই ওটিপি লগ করার পর ট্যাঙ্কারের লক খুলবে। প্রশ্ন, অত্যাধুনিক ই- লকিংয়ের পরও কিভাবে চুরি হচ্ছে জ্বালানি তেল? অভিযোগ, ট্যাঙ্কারের জিপিএস সিস্টেমে ব্যাটরির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাতে সিস্টেমে রুটে গাড়ি চালানো দেখায়। দ্বিতীয়ত, ট্যাঙ্কারের ঢাকনার ওপর বসানো মোটা রড গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে কিম্বা বাঁকিয়ে দেওয়া হয়। তার পর টুলু পাম্প বসিয়ে ট্যাঙ্কার থেকে তেল চুরি করা হয় বলা অভিযোগ। তেল কাটিংয়ের পর আবারও ওই রড লাগিয়ে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে, অবশ্যই কড়া হাতে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জনবহুল সড়কের পাশে বনভুমি দখল করে ঝুঁকি নিয়ে অবাধে চলছে জ্বালানি তেল চুরি। ১৯ জাডীয় সড়কের ওপর রাজবাঁধ, বিরুডিহা, পানাগড় -মোরগ্রাম রাজ্যসড়কের ওপর বিলপাড়া, চারের মাইল এলাকায় রমরমিয়ে চলছে ঝুঁকি নিয়ে এই তেল কাটিংয়ে রমরমা কারবার। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ট্যাঙ্কার পার্কিংয়ের নামে অবৈধ তেলের ডিপো। বিলপাড়া এলাকায় গ্যারেজের নজর এড়াতে সবুজ কাপড় দিয়ে ঘেরা। সামনে টায়ার পাম কিম্বা গ্রিজিংয়ে পশরা রেখে তার ভেতরে চলছে তেল কাটিং। আবার কাঁকসার চারের মাইলে বনভুমি দখল করে চলছে তেল কাটিং। জ্বালানি তেলের অবৈধ কাটিং এর দরুন নষ্ট হচ্ছে সবুজ অরন্য। বিপন্ন হচ্ছে জঙ্গল। তার ওপর ওইসব তেল কাটিংয়ে সকাল বিকাল নিয়ম করে চলছে মদের আসর। সেখান থেকে অস্রাব্য গালিগালাজ, চলছে অসামাজিক কাজ।তার জেরে আতঙ্কে আশপাশের গ্রামবাসী। চালা ঘরের ছাউনিতে মজুত ব্যারেল ব্যারেল ডিজেল। এছাড়াও রাখা হচ্ছে ফাইবার ট্যাঙ্ক। প্রায় হাজার লিটারের ক্যাপাসিটির ৬-৮ টি বিশালাকার ট্যাঙ্ক রয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহনে ভর্তি করা হয়। জাতীয় সড়কের পাশে এরকম গোটা পনেরো পার্কিংয়ের নামে চোরাই তেল কাটিংয়ের রমরমা কারবার চলে।
আবার প্রশ্ন, এসব পার্কিংয়ে কোনরকম অগ্নিকান্ড ঘটলে, বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও বায়ুসেনা ছাউনির কয়েক'শ মিটার দুরে ওইসব অবৈধ ডিপো। প্রশ্ন উঠেছে বিস্ফোরক বিভাগ ও দমকল বিভাগের নজরদারিতে। যদিও এবিষয়ে দমকল বিভাগের কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগ একশ্রেনীর পুলিশের আধিকারিকদের মদতে চলছে, এসব চোরাই তেল কাটিংয়ের রমরমা কারবার। পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দারা ইতিমধ্যে পানাগড় বনবিভাগে অভিযোগ দায়ের করেছে গ্রামবাসীরা। তাদের অভিযোগ, কোনরকমভাবে আগুন লাগলে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটবে। তাই আতঙ্কে আছি। এছাড়াও ওখানে যেভাবে অস্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ হয়, পাশ দিয়ে যাতায়াত করা যায় না। তাই বন্ধ করা হোক ওই বেআইনী তেলের কাটা। কংগ্রেস নেতা দেবেশ চক্রবর্তী বলেন, আগে তৃণমূল কংগ্রেসের মদতে যত অবৈধ তেল চুরি, বালি চুরি, কয়লা চুরি, মাটি চুরি সবই চলত। রাজ্যে নতুন সরকার। এখন বিজেপির মদতে চলছে। মুখে বড় বড় ফিরিস্তি। আর সিন্ডিকেটরাজ, মাফিয়ারাজ সবই বহাল রয়েছে। এসব অবৈধ কাজ বন্ধ করা হোক। তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুক্রবার পানাগড় বনবিভাগ জানিয়েছে, অভিযোগ একরা এসেছে। জঙ্গল লাগোয়া এসব অবৈধ জ্বালানি তেল কারবার বন্ধের জন্য পুলিশকে জানানো হয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা