
কলকাতা, ২৮ মার্চ (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এসে শনিবার তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র নিশানা করলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, রাজ্যে গত ১৫ বছর ধরে ভয়, দুর্নীতি এবং তোষণের রাজনীতি চলছে এবং আসন্ন নির্বাচন ঠিক করবে যে বাংলার জনতা ভয়কে বেছে নেবে নাকি ভরসাকে।
এর সঙ্গেই অমিত শাহ তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত চার্জশিট পেশ করেন। তিনি বলেন, এটি কোনও একটি দলের নথি নয় বরং বাংলার মানুষের কণ্ঠস্বর, যা তাঁর দল সামনে নিয়ে আসছে। তিনি বলেন, এই চার্জশিট রাজ্য সরকারের ১৫ বছরের কালো অধ্যায়ের সংকলন।
নিজের ভাষণে অমিত শাহ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সহানুভূতির রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে বলেন যে, তিনি সর্বদা নিজেকে পীড়িত দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন যে, কখনও চোট পাওয়ার ঘটনা সামনে আসে, কখনও মাথায় পট্টি বেঁধে সহানুভূতি নেওয়ার চেষ্টা হয়, কখনও অসুস্থতার দোহাই দেওয়া হয় এবং কখনও নির্বাচন পরিচালনাকারী সাংবিধানিক সংস্থার ওপর অভিযোগ তোলা হয়। তিনি বলেন যে, জনতা এখন এসব বুঝে গিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলার এই নির্বাচন কেবল সরকার বদলানোর নির্বাচন নয় বরং রাজ্যকে ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্ত করার নির্বাচন। তিনি দাবি করেন যে, রাজ্যে সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষা নিয়ে ভয় থাকে, সম্পত্তি লুঠ হওয়ার ভয় তৈরি থাকে, মহিলাদের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তা থাকে এবং যুবকদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
অমিত শাহ তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ওপর গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন যে, রাজ্যে সংগঠিত তোলাবাজি তন্ত্র খাড়া করা হয়েছে এবং দুর্নীতি ব্যবস্থার অংশ হয়ে গিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অপরাধী গোষ্ঠী সক্রিয় এবং সাধারণ মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে। তিনি এও বলেন যে, বিকাশের অভাবে বাংলা শিল্পের জন্য কবরখানায় পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং একে রাজনৈতিক মদত দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, সীমান্ত এলাকা থেকে হওয়া অনুপ্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাঁর বক্তব্য ছিল যে, যদি তাঁর দল ক্ষমতায় আসে তবে এমন শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অমিত শাহ দাবি করেন যে, তাঁর দলের জনভিত্তি ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন যে, গত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলে যে বিজেপির ভোটের শতাংশ এবং আসনের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে এবং এখন দল রাজ্যে একটি মজবুত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের ভাষণে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বাড়তে থাকা জনভিত্তিরও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দল ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং মাত্র ২ টি আসন পেয়েছিল, যেখানে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলের ভোটের শতাংশ বেড়ে ৪১ শতাংশ হয় এবং আসনের সংখ্যা বেড়ে ১৮ পর্যন্ত পৌঁছায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দল ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং ১২ টি আসন হাসিল করেছে।
তিনি বিধানসভা নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ১০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং দলকে ৩টি আসনে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল, কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভোটের শতাংশ বেড়ে ৩৮ শতাংশ হয় এবং দল ৭৭টি আসন জিতে ভিত মজবুত করে।
অমিত শাহ দাবি করেন যে, এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্রমাগত নিজেদের জনভিত্তি মজবুত করেছে এবং এখন প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটের সাথে দল রাজ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি নির্বাচনের আগে পুরো রাজ্য সফর করে অব্যবস্থা, আর্থিক দুর্দশা এবং অনুপ্রবেশের মতো ইস্যুগুলি জনতার মধ্যে তুলে ধরেছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরও প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন যে, বাংলায় নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি এমন যে সুপ্রিম কোর্টকে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের মোতায়েন করতে হয়েছে, যেখানে অন্য রাজ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি একে রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেন।
তিনি এও বলেন যে, যেখানে তাঁর দলের ডবল ইঞ্জিন সরকার রয়েছে, সেখানে উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে হয়েছে। তিনি উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, অসম, ত্রিপুরা এবং ওড়িশার উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, এই রাজ্যগুলিতে উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা এবং আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
শেষে অমিত শাহ বলেন যে, বাংলার জনতাকে এটা ঠিক করতে হবে যে তারা ভয়, দুর্নীতি এবং হিংসার রাজনীতি জারি রাখতে চায় নাকি শান্তি, উন্নয়ন এবং বিশ্বাসের পথে এগিয়ে যেতে চায়। তিনি আশা ব্যক্ত করে বলেন যে, এবার জনতা তাঁর দলকে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি