
কলকাতা, ৭ মার্চ (হি.স.): সরকারি অর্থে তৈরি চিকিৎসক-ইঞ্জিনিয়াররা আমলা হলে সেটা কি সত্যি সরকারি অর্থের শ্রাদ্ধ? সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন গৌতম ভট্টাচার্য। তাঁর নিজের দাদাও ছিলেন তাই। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট এবং প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী, অধুনা অবসরপ্রাপ্ত, লেখক-বিশ্লেষক গৌতম ভট্টাচার্য জানালেন এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধির কথা।
ইউ.পি.এস.সি-র সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় আজকাল বহুল সংখ্যায় ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, এম.বি.এ, চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্টরা বসছেন এবং সফলও হচ্ছেন। একজন প্রশাসকের কর্মজীবনে এই ধরণের প্রফেশনাল কোর্স করে আসা ছাত্রছাত্রীদের ‘নলেজ’ বিশেষ কাজে আসে না। তাই কেউ কেউ মনে করেন প্রফেশনালদের সিভিল সার্ভিসে আসা সময় ও অর্থের বিচারে সমাজের অপচয়, এর পরিবর্তন হওয়া দরকার। আমি অবশ্য এই মতকে সমর্থন করি না, কেন করি না সেটাই বলবো।
সত্তরের দশক পর্যন্ত সিভিল সার্ভিসে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তাররা আসতেন না বললেই চলে। সেই যুগে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, এম.বি.এ পড়ার কলেজও অনেক কম ছিল। দু-একজন ব্যতিক্রমি মেধাবী ছাত্র ছাড়া এই প্রফেশনালরা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসতেন না। এই ধারার পরিবর্তন সূচিত হলো আশির দশক থেকে। আশির দশকের শেষের দিকে দেখা গেলো সর্ব ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ পরাক্ষার্থীদের প্রায় ১০ শতাংশই প্রফেশনাল কোর্স করে আসা ছাত্রছাত্রী।
নব্বইয়ের দশক থেকে যখন দেশজুড়ে প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিক্যাল কলেজে ছেয়ে গেলো তখন থেকে সিভিল সার্ভিসেও ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের পরীক্ষা দেওয়ার প্রবণতা ভীষণভাবে বেড়ে গেলো।এতে বিস্ময়ের কিছু নেই: যেই ছেলেটি আগে হলে কেমিস্ট্রিতে অনার্স করে বা এম.এস.সি. করে সিভিল সার্ভিসের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতো, আজ সে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে সেই পরীক্ষায় বসছে।
ফিজিক্স বা অর্থনীতি পাঁচ বছর পড়ে একজন ছাত্র যখন সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়, তাঁর পুঁথিগত বিদ্যাও কর্মজীবনে সেরকম কাজে দেয় না। তাতে যদি সমাজের ক্ষতি না হয় তাহলে পাঁচ-ছ’ বছর ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি পড়ে প্রশাসক হলে এরকম গেলো গেলো রব তোলার কোনো যুক্তি আমি পাই না। প্রতি বছর ভারতবর্ষে লক্ষ-লক্ষ ছাত্রছাত্রী ইঞ্জিনিয়ারিং-ডাক্তারি পাশ করছে, তার মধ্যে কয়েক শ’ মেধাবী ছাত্রছাত্রী যদি প্রশাসনে আসে, তাতে তো প্রশাসনেরই ট্যালেন্ট-পুলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। এতে উৎসাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, দুর্ভাবনা করার মতো কিছু নেই।
আসলে ট্যালেন্ট পুলের বৈচিত্র্য থাকাটা যারা একদিন উচ্চ পদাধিকারী হবেন তাঁদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। CAT পরীক্ষার মাধ্যমে IIM গুলোতে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয়। একসময় দেখা গেসলো মেরিট লিস্টের প্রায় সকলেই জেনারেল ক্যাটাগোরির (G) ইঞ্জিনিয়ার (E) এবং প্রায় সকলেই পুরুষ বা মেল (M). বাজারের পরিভাষায় এই পরীক্ষার্থীদের বলা হতো GEM. কর্তৃপক্ষ মনে করলেন ট্যালেন্ট পুলের বৈচিত্র্যের প্রয়োজনে GEM দের মনোপলি ভাঙা দরকার।
এখন তাই ইন্টারভিউতে ডাক পাবার জন্য যে পার্সেন্টাইল সেটা বিভিন্ন ক্যাটাগোরির জন্য বিভিন্ন। ইঞ্জিনিয়ারিং করে জেনারেল ক্যাটাগোরির একটি ছেলে যে পার্সেন্টাইল পেয়ে ইন্টারভিউতে ডাক পেলো না, তার থেকে বেশ কিছু কম পার্সেন্টাইল পেয়েও জেনারেল ক্যাটাগোরির ইঞ্জিনিয়ার মেয়েটি ডাক পেয়ে যাবে। ঠিক একই রকমভাবে জেনারেল ক্যাটাগোরির ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি যে পার্সেন্টাইল পেয়ে ইন্টারভিউতে ডাক পেলো না, তার থেকে বেশ কিছু কম পার্সেন্টাইল পেয়েও একই ক্যাটাগোরিতে কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়ে আসা ছেলেটি ডাক পেয়ে যাবে। - এইভাবেই IIM কর্তৃপক্ষ এ্যাডমিশনে ট্যালেন্ট পুলের বৈচিত্র্যের অভাব মেটাবার চেষ্টা করছেন।
ইউ.পি.এস.সি. এখনো সেরকম কিছু না করেই কিন্তু ট্যালেন্ট-পুলের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারছে। মহিলারা যথেষ্ট সংখ্যায় হায়ার সিভিল সার্ভিসে আসছেন। যারা পরীক্ষায় সফল হয়ে চাকরীতে যোগ দিচ্ছেন তাঁরা দেখা যাচ্ছে ছাত্রজীবনে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে চর্চা করেছেন। - এই বৈচিত্র্যই হায়ার সিভিল সার্ভিসের শক্তি আর সেই শক্তির ওপর ভিত্তি করেই বেঁচে আছে, যাকে সর্দার বল্লভভাই প্যটেল বলেছিলেন “স্টিল ফ্রেম অব্ ইন্ডিয়া”! যদি ভবিষ্যতে কখনো দেখা যায় ইঞ্জিনিয়ার- ডাক্তাররাই সিভিল সার্ভিসের সব সিট দখল করে নিচ্ছেন তখন বৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য ইউ.পি.এস.সি.কে অন্য কিছু ভাবতে হবে, তবে এখনো সেদিন আসে নি। -
বিভিন্ন দেশে হায়ার সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ধরণ বিভিন্ন রকম। ভারতের মতো বহুমাত্রিক দেশে গত প্রায় দেড়শো বছরের বেশী সময় ধরে যেই পদ্ধতি বিবর্তিত হয়েছে, তার শক্তিটা আমাদের বুঝতে হবে। অন্য দেশকে অনুকরণ না করে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / মৌসুমী সেনগুপ্ত