
ভোপাল, ১১ এপ্রিল (হি.স.) : “কৃষকরাই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাঁদের ছাড়া আমাদের খাদ্যব্যবস্থা অসম্পূর্ণ”—এই মন্তব্য করে কৃষকদের কল্যাণে সরকারের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেন, দেশের সীমান্তে জওয়ান এবং মাঠে কৃষক—এই দুই শক্তিই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তোলে।
শনিবার মধ্যপ্রদেশের রায়সেন জেলার দশেরা ময়দানে আয়োজিত তিনদিনব্যাপী ‘উন্নত কৃষি মহোৎসব-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, কৃষকের হাসিই দেশের প্রকৃত সম্পদ। প্রতিকূলতা, প্রাকৃতিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও কৃষকেরা নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছেন। তাঁদের উন্নয়ন ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা কেন্দ্র সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলেও তিনি জানান।
নিজেকে ‘কৃষকপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে কৃষকদের সমস্যা ও চাহিদা সম্পর্কে তিনি অবগত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও কৃষকদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অপরিবর্তিত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, কৃষকদের উন্নয়নে কোনও আর্থিক ঘাটতি রাখা হবে না এবং সরকার সর্বতোভাবে তাঁদের পাশে থাকবে।
কৃষকদের আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধি প্রকল্পের উল্লেখ করে বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর প্রতিটি যোগ্য কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার টাকা সরাসরি স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা কৃষি উপকরণ ক্রয়ে সহায়ক। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানে এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব সহ ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের মহাপরিচালক ছাড়াও সারা দেশ থেকে আগত কৃষি বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন।। তাঁদের উপস্থিতিতে কৃষি মহোৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সূচনা করা হয়।
এদিন কৃষকদের সুবিধার্থে ‘সয়েল মোবাইল অ্যাপ ই-ফর্ম’ চালু করা হয়। এই অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকেরা নিজেদের জমির মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কোন ফসল চাষ উপযোগী তা নির্ধারণ করতে পারবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় উপভোক্তাদের হাতে সরাসরি সুবিধা তুলে দেওয়া হয় এবং সফল কৃষকদের সম্মানিত করা হয়।
রাজনাথ সিং বলেন, মাটি স্বাস্থ্য কার্ড প্রকল্প কৃষকদের সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগে সাহায্য করছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ কমছে এবং ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দেশের কৃষি বাজার ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন মণ্ডিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, ফলে কৃষকেরা এখন ঘরে বসেই নিজেদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের উপর নির্ভরতা কমছে।
তিনি আরও জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে সেনা ছাউনির আশেপাশের কৃষকদের কাছ থেকে জৈব ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফল ও সবজি সরাসরি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে জওয়ানদের স্বাস্থ্যও উন্নত হচ্ছে।
‘শ্রীঅন্ন’ বা মিলেট চাষের প্রসারে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এই ধরনের পুষ্টিকর শস্য চাষের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং পুষ্টি নিরাপত্তা—দুটিই নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকার এই ক্ষেত্রেও কৃষকদের উৎসাহিত করছে।
যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ড্রোন, সেন্সর, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কৃষিকে আরও উন্নত, লাভজনক ও টেকসই করে তোলা সম্ভব। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রদেশ সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের নেতৃত্বে রাজ্য দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। রায়সেনের উর্বর ভূমিতে আয়োজিত এই কৃষি মহোৎসব রাজ্যের কৃষকদের আর্থিক উন্নয়ন এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এও বলেন, গ্রাম ও কৃষিক্ষেত্রে অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমাদের সরকার কৃষকদের কল্যাণে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অর্থ কিংবা সম্পদের কোনও ঘাটতি থাকবে না। প্রতিটি কৃষক যাতে যথাযথ সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করতে আমাদের সরকার সর্বদা কাজ করে এসেছে। আমি দীর্ঘকাল ধরে জনজীবনে যুক্ত আছি এবং কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত ছিল। আমার অন্তরের সেই কৃষকসত্তা কখনোই হারিয়ে যায়নি। আজও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমি পূর্ণ আস্থার সঙ্গে বলতে পারি যে—কৃষকদের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১১ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই উৎসবে ড্রোন, সৌর পাম্প এবং ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থার মতো আধুনিক প্রযুক্তির সরাসরি প্রদর্শনী থাকছে। চারটি সেমিনার হলে ২০টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করবেন; আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার থেকে শুরু করে সমন্বিত কৃষিপদ্ধতি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই উৎসবে ৩০০-রও বেশি প্রদর্শক অংশগ্রহণ করছেন এবং ৫০ হাজারেরও বেশি কৃষক এতে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী ১৩ এপ্রিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়করির উপস্থিতিতে মহোৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য