
অভাবনীয় সাফল্যের জন্য প্রত্যন্ত গম্ভীরা চা বাগান স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন
শিলচর (অসম), ১২ এপ্রিল (হি.স.) : এবারের মাধ্যমিক (এইচএসএলসি) পরীক্ষায় বরাক উপত্যকার তিন জেলার সরকারি স্কুলের শোচনীয় ফলাফলে গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করার পাশাপাশি অভাবনীয় সাফল্যের জন্য প্রত্যন্ত গম্ভীরা চা বাগানের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন জানিয়েছে প্রাক্তনী সারা কাছাড়-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দি ছাত্র সংস্থা (আকসা)।
এক প্রেস বার্তায় আকসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রদীপ দত্তরায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এইচএসএলসি পরীক্ষায় এ বছর বরাকের তিন জেলার ছাত্রছাত্রীদের যে শোচনীয় ফলাফল রীতিমতো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সরকারি স্কুলের এ ধরনের ফলাফল নিয়ে অবশ্যই গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন। তিনি বলেন, কাছাড় জেলায় পাশের হার মাত্র ৪৯.৩ শতাংশ। শিলচরের গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল থেকে মাত্র একজন পাশ করেছে। অধিকাংশ সরকারি স্কুলেরই একই অবস্থা। এমন-কি বেসরকারি স্কুলে ফলাফলও অন্যান্য বছরের তুলনায় নিম্নমানের।
প্রদীপ দত্তরায় বলেন, সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবার থেকে আসে। তারা অভিভাবকদের থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। কিন্তু এই খারাপ ফলাফলের জন্য শুধু ছাত্র কিংবা শিক্ষকদের কাঠগড়ায় তুললে হবে না, জেলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কোনও অংশেই কম দায়ী নয়।
তিনি বলেন, অনেক স্কুলে বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক বিষয়ের পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। স্কুল পরিদর্শকরা খুব কমই পরিদর্শনে যান। যার ফলে একটি নির্দিষ্ট শৈক্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ, রূপায়ণ ও জবাবদিহিতা প্রায় নেই বললে চলে। এছাড়া শিক্ষকদের প্রায়ই পড়ানোর বাইরে অন্য কাজে জুড়ে দেওয়া হয়, যা নিয়মিত পঠনপাঠন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিগুলিও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়, এমন সব ব্যক্তি দায়িত্বে রয়েছেন যাঁদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগ নেই বা তেমনটা গড়ে নেওয়ার আগ্রহও নেই। এছাড়া রয়েছে পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা। এখনও অনেক স্কুলে পরিষ্কার শৌচাগার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানীয় জল এবং উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষের মতো অত্যাবশ্যক সুবিধার অভাব রয়েছে।
প্রাক্তন ছাত্রনেতা দত্তরায় বলেন, তাঁরা অবিলম্বে জেলা প্রশাসন তথা সরকারকে এ সব ব্যাপারে সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন। তিনি আরও বলেন, যেহেতু শিক্ষার সাথে ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সরাসরি সংযোগ ও ভূমিকা রয়েছে, তাই জেলা প্রশাসন অবিলম্বে এই তিন স্তরের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসুক।
তিনি বলেন, বরাক উপত্যকায় অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী রয়েছেন, যাঁরা এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। তাই অবিলম্বে সরকার তথা প্রশাসনকে তাঁদের সাথে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে, বরাকের শিক্ষা ব্যাবস্থার সংস্কারের কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রদীপ দত্তরায়।
প্রেস বার্তায় প্রাক্তনী আকসা-র সভাপতি হিলাল উদ্দিন লস্কর বলেন, বরাকের শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুর্দিনে কিন্তু আশার আলো দেখিয়েছে রামকৃষ্ণনগর শিক্ষাখণ্ডের প্রত্যন্ত গম্ভীরা চা বাগানের স্বাধীনতা সংগ্রামী পীতাম্বর কুর্মি আদর্শ বিদ্যালয়। তিনি বলেন, ওই স্কুলের পাশের হার ৭২.৫ শতাংশ, যার মধ্যে ২০ জন প্রথম বিভাগ ও ৩০ জন দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। ৩২ জন পরীক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়েছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, ওই স্কুলের পঞ্চমী নাথ ও প্রিয়া দাস বাংলায় একশোয় একশো নম্বর পেয়ে বরাকের নাম উজ্জ্বল করেছে। একইভাবে জ্যোতিকা কোহার ও সোনাক্ষী দাসও সংস্কৃতে একশোয় একশো নম্বর পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।
হিলাল উদ্দিন বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার এই ছাত্রীরা যে কাজটি করে দেখিয়েছে ভাষা শহিদদের ভূমির বাসিন্দা হিসেবে তা প্রত্যেক বরাকবাসীর গর্বের ব্যাপার। তিনি বলেন, সরকারি স্কুলের ফলাফল যেমন একদিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে সুস্থ পরিবেশ ও শিক্ষক তথা বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির ইচ্ছাশক্তি ও সক্রিয় ভূমিকা থাকলে সরকারি স্কুলের ফলাফলে উৎকর্ষতা বৃদ্ধি অবশ্যই সম্ভব, তেমনি এটাও প্রমাণ করেছে, এখানে গ্রামীণ এলাকায়ও মেধার অভাব নেই।
হিলাল উদ্দিন লস্কর ওই ছাত্রীদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে আগামীতে তাঁদের উত্তরোত্তর সাফল্যম কামনা করেছেন। একইসাথে তিনি বরাক উপত্যকার সমস্ত উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী ছাত্রীদের অভিনন্দন তথা উৎসাহ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস