

কলকাতা, ২১ এপ্রিল (হি.স.) : রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সেখানে তিনি রাজ্য ও কেন্দ্রের নীতি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেই প্রসঙ্গে বামেদের অবস্থান নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের সূচনায় তাঁকে পুষ্পস্তবক দিয়ে স্বাগত জানান প্রেস ক্লাবের সহ-সম্পাদক নিতাই মালাকার। বক্তব্যের শুরুতেই রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে সেলিম অভিযোগ করেন, “মাফিয়ারাজে” রাজ্যে রাজনৈতিক কর্মীদের প্রাণহানি ঘটছে, অথচ সেই সব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছরে রাজ্যে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে সরব হলেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, প্রশাসনের মদতে অপশাসন ও দুর্নীতি হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সেলিম। তিনি অভিযোগ করেন, আদর্শ আচরণবিধি চলাকালীন বিভিন্ন জায়গায় হিংসার ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষত ইসলামপুরে এক সিপিএম কর্মী খুনের ঘটনায় কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতেও কমিশন ব্যর্থ হয়েছে এবং বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও সামনে আসছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনায় তিনি বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকেই নানা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য সামনে আসছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উক্তি ভুলভাবে উদ্ধৃত করার প্রসঙ্গ টেনে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “ওরা প্রায় সব কিছুর সঙ্গেই ‘জি’ যোগ করে দেন।” তাঁর বক্তব্য, বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর স্বতন্ত্র— “বাংলার পাড়ায় পাড়ায় ‘জি’ থাকতে পারে, কিন্তু ‘নেতাজি’ একটাই।” পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা বাংলার ইতিহাস-সাহিত্য সম্পর্কে অবগত নন, তাঁদের পক্ষে নেতাজির ভাবনা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সেলিম অভিযোগ করেন, রাজ্যের একাধিক সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে তিনি একটি রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার সঙ্গে রাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন।
রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেলিম বলেন, একসময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় থাকা বাংলা আজ কর্মসংস্থান ও শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সরকারি চাকরিতে বিপুল শূন্যপদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রেও সঙ্কটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আলুচাষিদের দূরাবস্থা তুলে ধরেন। নারী নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এই প্রেক্ষিতে আসন্ন নির্বাচনের আগে ব্লক স্তর থেকে রাজ্য স্তর পর্যন্ত উন্নয়নের লক্ষ্যে দলের তরফে তিন দফার ইস্তেহার পেশ করা হয়েছে বলে জানান সেলিম।
তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুর্গাঅঙ্গন’ তৈরির উদ্যোগকে কটাক্ষ করে বলেন, এটি হিন্দুত্ব নয়, বরং মন্দিরকেন্দ্রিক রাজনীতি। তাঁর মতে, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন—মন্দির বা মসজিদ নির্মাণ নয়। সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে সেলিম বলেন, “ভাঙা বুক দিয়েই নতুন বাংলা গড়ব।”
উল্লেখ্য, এর আগে বিগত শনিবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’–এ পৃথকভাবে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সুনন্দা দাস / সৃজিতা বসাক