




লেহ, ২৯ এপ্রিল (হি.স.): মহাত্মা বুদ্ধের পবিত্র দেহাবশেষ বুধবার সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে নয়াদিল্লি থেকে লাদাখের রাজধানী লেহ-তে এসে পৌঁছেছে। জনসাধারণের দর্শনের জন্য এই দেহাবশেষ আনা হয়েছে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এসে পৌঁছানো এই দেহাবশেষ হেড অফ স্টেটের মর্যাদাপ্রাপ্ত। লেহ-র বিমানবন্দরে ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ রীতিতে অভ্যর্থনা জানানোর পর, সেগুলোকে চোগলামসারের জেভেটসালে নিয়ে যাওয়া হয়। লাদাখে ১ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এই দেহাবশেষ জনসাধারণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, একাধিক দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাই কমিশনারদেরও লেহ-তে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার লেহ-র বিমানবন্দরে বিভিন্ন মঠের ধর্মগুরু, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে পবিত্র নিদর্শনকে স্বাগত জানান। বিমান থেকে নামার পর আনুষ্ঠানিক আচার সম্পন্ন করা হয় এবং সেগুলিকে জেভেটসালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে জেভেটসাল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে হাজার হাজার ভক্ত রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পুষ্প অর্পণ করেন। পুরো রাস্তাটি ঐতিহ্যবাহীভাবে সজ্জিত করা হয় এবং অনেক স্থানে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়।
লাদাখের উপরাজ্যপাল বিনয় কুমার সাক্সেনা বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং লাদাখের জনগণ বছরের পর বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
লেহ-র চোগলামসারের জেভেটসালে বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যে পবিত্র নিদর্শন স্থাপিত হয়েছে। ১ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত আমজনতার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই সময়ে ভারত ও বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের আগমনের প্রত্যাশা প্রশাসন| সেই কারণে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনী স্থলে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে| সেখানে লাদাখের পুলিশ যেমন আছে, তেমনই কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাও মোতায়েন করা হয়েছে| পুরো এলাকা সিসিটিভি এবং ড্রোন নজরদারির আওতায় রয়েছে। ভিড়ের চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাও বিশেষভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য চিকিৎসা শিবির, অ্যাম্বুলেন্স, পানীয় জল, অস্থায়ী শৌচাগার এবং গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে নিরাপত্তা, যান চলাচল এবং অন্যান্য ব্যবস্থা সঠিক সময়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
১ মে, বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে জেভেটসালে একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। বিভিন্ন বৌদ্ধ রীতি অনুসারে প্রার্থনা, ধ্যান এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হবে। এই উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, তাতে ঐতিহ্যবাহী লাদাখের শিল্প ও সঙ্গীত পরিবেশিত হবে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুই দিনের সফরে ৩০ এপ্রিল লাদাখে পৌঁছাবেন। তিনি ১ মে বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে জেভেটসালে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের রাষ্ট্রদূত এবং প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও এই সময়ে লেহ-তে এসে পৌঁছাচ্ছেন।
মে মাসের শুরুতেই ক্রমবর্ধমান পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কথা মাথায় রেখে হোটেল, গেস্ট হাউস এবং পরিবহন ব্যবস্থা সুগম করা হয়েছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসন পর্যায়ক্রমিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালু করছে। এই অনুষ্ঠানের জন্য লেহ শহরকে বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। রাস্তা, জনবহুল স্থানগুলিতে এক হাজারেরও বেশি ফুলের টব দিয়ে সাজানো হয়েছে। বিশেষ ভবন এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে। লেহ প্রাসাদ এবং অন্যান্য স্থানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত হয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করছেন, এর ফলে শহর জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পবিত্র নিদর্শন জাঁস্কর অঞ্চলেও প্রদর্শিত হবে। সেখানে ১১ এবং ১২ মে দর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। এর জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষভাবে পরিবহন ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরাও দর্শনের সুযোগ পান।
পবিত্র নিদর্শনগুলি উত্তর প্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলার পিপরাহওয়া স্তূপের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ আমলে হওয়া খননকার্যের ফলে একটি পাথরের পাত্রে বুদ্ধ-র নিদর্শন, রত্ন এবং অন্যান্য সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল। এই আবিষ্কার বৌদ্ধ ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বক্ষণ দ্বারা পরিচালিত খননকার্যে পাত্র এবং অস্থি-নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, যেগুলোকে বুদ্ধের নিদর্শন হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর নিদর্শনসমূহকে আটটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। এই নিদর্শনগুলো বিভিন্ন স্থানের স্তূপে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে সম্রাট অশোক এই নিদর্শনগুলো একত্র করে হাজার স্তূপ নির্মাণের নির্দেশ দেন| এর মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ব্রিটিশ আমলে পিপরাহওয়া থেকে উদ্ধার হওয়া নিদর্শনের একটি অংশ বিভিন্ন জাদুঘরে পাঠানো হয়। কিছু রত্ন ও পবিত্র নিদর্শন বিদেশে পাঠানো হয়েছিল| আবার অনেক নিদর্শন ভারতেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এই নিদর্শনগুলি জাতীয় জাদুঘর সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হচ্ছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে, ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত এই পবিত্র নিদর্শনগুলি ভারত ও বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রদর্শন করা হয়েছে। এই নিদর্শনগুলি মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের মতো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশগুলিতে প্রদর্শিত হয়েছে| বহু ভক্ত তা দর্শন করেছেন। আর ভারতে এই পবিত্র নিদর্শনগুলি জাতীয় জাদুঘর (নয়াদিল্লি), গুজরাটের ভাদনগর, মুম্বই, পাটনা, রাজগির, কলকাতা, ভুবনেশ্বর, অমরাবতী এবং সারনাথের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে প্রদর্শন করা হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ