
রাঁচি, ৩ এপ্রিল (হি.স.): সিপিআই (মাওবাদী)-র অন্যতম শীর্ষ নেতা, সংগঠনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ এবং একসময়ের এক কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষিত নকশাল নেতা প্রশান্ত বোস ওরফে কিষেণ দা-র মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর শুক্রবার রাঁচির বিরসা মুন্ডা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। জেল আইজি সুদর্শন মণ্ডল এই খবর নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং পুণের ভীমা কোরেগাঁও হিংসা মামলায় প্রশান্ত বোসের নাম উঠে আসে। জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-র চার্জশিটেও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত ছিল। পাশাপাশি ২০১৩ সালে ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলের ঝিরম ঘাঁটি হামলায় কংগ্রেস নেতা বিদ্যাচরণ শুক্ল, নন্দকিশোর প্যাটেল, মহেন্দ্র কর্মা-সহ প্রায় ৩০ জন নেতার হত্যাকাণ্ডে তাঁর অনুমোদন ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
২০১১ সালের ১২ নভেম্বর ঝাড়খণ্ড পুলিশ ও সিআরপিএফ-এর যৌথ অভিযানে সেরাইকেলার জেলার কান্দ্রা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি গাড়ি থেকে প্রশান্ত বোস, তাঁর স্ত্রী শীলা মারান্ডি, তাঁর নিরাপত্তারক্ষী এবং আরও কয়েকজন সহযোগীকে আটক করা হয়। গ্রেফতারের সময় তাঁর মাথার ওপর এক কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা ছিল।
গ্রেফতারের পর থেকেই তিনি রাঁচির কারাগারে বন্দি ছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে চিকিৎসার জন্য আরআইএমএস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশান্ত বোস দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনের অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ বা ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরো সদস্য এবং পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক ব্যুরোর (ইআরবি) প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর দায়িত্বের আওতায় ছিল বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ছত্তিশগড়-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা, এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশও।
সংগঠনের বিস্তার ও শক্তিশালীকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঝাড়খণ্ডের পারসনাথ, সারান্ডা জঙ্গল এলাকা এবং ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাওবাদী ঘাঁটি গড়ে তুলতে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তদন্তকারীদের মতে, দেশের একাধিক বড় নকশাল হামলার পরিকল্পনা ও অনুমোদনে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ড-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ৭০টিরও বেশি মামলা দায়ের ছিল, অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী শীলা মারান্ডির বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার যাদবপুর এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত বোস ছাত্রজীবনেই নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকে শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। পরে এমসিসিআই (মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার অফ ইন্ডিয়া)-র প্রতিষ্ঠাতা কনহাই চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করে সংগঠনকে বিস্তার করেন। ২০০৪ সালে এমসিসিআই ও পিপলস ওয়ার গ্রুপ (পিডব্লিউজি)-এর সংযুক্তির মাধ্যমে গঠিত সিপিআই (মাওবাদী)-তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় আসেন এবং দ্রুত সংগঠনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে উন্নীত হন।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাক্তন আধিকারিকদের মতে, প্রশান্ত বোস ছিলেন মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি, যিনি সংগঠনের কৌশল নির্ধারণ, বিস্তার এবং বড় বড় হামলার পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জেরা থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছিল তদন্তকারী সংস্থাগুলি, যা নকশাল দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
প্রশান্ত বোসের মৃত্যুতে ভারতের নকশাল আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল বলে মনে করা হচ্ছে। নিরাপত্তা মহলের মতে, তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী নেতার অভাব সংগঠনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য