
কলকাতা, ৯ এপ্রিল ( হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট যত এগিয়ে আসছে, রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ ততই চড়ছে। বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া, পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল এবং বীরভূমের সিউড়িতে আয়োজিত বিশাল জনসভা থেকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একযোগে খড়গহস্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠনের ডাক দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি।
হলদিয়ার মাখনবাবুর বাজার এলাকার সভামঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী এক সঙ্গে কাজ করলেই বাংলার লাভ। তাই রাজ্যে চাই ডবল ইঞ্জিন সরকার।” তিনি দাবি করেন, পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রাম পরিবর্তনের যে পথ দেখিয়েছিল, এবার তার পুনরাবৃত্তি হবে ভবানীপুর-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গে।
তৃণমূলকে বিঁধে মোদী বলেন, “দেশ এগোলেও এই নির্মম সরকার বাংলাকে পিছিয়ে দিয়েছে। হলদিয়ার কারখানায় তালা ঝুলছে। তৃণমূল রাজ্যের যুব সমাজকে ধোঁকা দিয়েছে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যেও ‘রোজগার মেলা’ শুরু হবে। সিন্ডিকেট রাজ নিয়ে তাঁর তোপ, “কারখানা সিন্ডিকেট বা ভয়ের মাধ্যমে চলে না, চলে আস্থার মাধ্যমে। বিজেপি সেই আস্থা ফিরিয়ে আনবে।” তোষণ রাজনীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, তৃণমূল সংবিধান ও আদালতকে তোয়াক্কা না করে ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা বিজেপি হতে দেবে না।
হলদিয়ার জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বাংলার মানুষের জন্য ছয়টি সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ঘোষণা করেন:
আস্থার পরিবেশ : ভয়ের পরিবেশ দূর করে আইনের শাসন ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।
জবাবদিহি : প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ ও উত্তরদায়ী করা হবে।
দুর্নীতির বিচার : প্রতিটি কেলেঙ্কারি ও মহিলাদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের (আরজি কর ও সন্দেশখালি প্রসঙ্গ) ফাইল পুনরায় খোলা হবে।
জেলযাত্রা : দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তি সে মন্ত্রী হোক বা প্রহরী—কারও রেহাই নেই, তাদের জায়গা হবে জেলে।
শরণার্থী ও অনুপ্রবেশ : শরণার্থীদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হবে, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য ভারতে কোনও স্থান নেই।
সপ্তম বেতন কমিশন : রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়া মাত্রই সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে।
আসানসোলের জনসভায় উপচে পড়া ভিড় দেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিম বর্ধমানের এই জনজোয়ারই প্রমাণ দিচ্ছে যে তৃণমূলের ‘পাপের ঘড়া’ পূর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, “আগামী ৪ মে-র পর রাজ্যে নতুন সরকার তৈরি হবে এবং বাংলা উন্নয়নের এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। এই পরিবর্তন এখন পাথরের লকির (সুনিশ্চিত)।” আসানসোল-দুর্গাপুর অঞ্চলের রুগ্ন শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল—তিন পক্ষকেই কাঠগড়ায় তোলেন। মোদী হুঙ্কার দেন, “যারা বাংলাকে লুটেছে, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে হিসেব নেওয়া হবে (সবকা হিসাব হোগা)।”
বীরভূমের সিউড়িতে আয়োজিত জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে কড়া অবস্থান নেন। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল সিন্ডিকেট অনুপ্রবেশকারীদের ভুয়ো সরকারি নথি সরবরাহ করে বাংলার জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। মোদী প্রতিশ্রুতি দেন, “বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসামাত্রই অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্ত শুরু হবে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে জেলে পাঠানো হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ও ছয়টি গ্যারান্টিকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এক্স (সাবেক টুইটার) বার্তায় লিখেছেন, “মোদীজির এই গ্যারান্টি মানে সুশাসনের গ্যারান্টি, উন্নয়নের গ্যারান্টি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মানের গ্যারান্টি।” হলদিয়ার সভায় প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও লক্ষাধিক মানুষের সমাগমকে ‘পরিবর্তনের জোয়ার’ বলে অভিহিত করেন তিনি। শুভেন্দুবাবুর মতে, “তৃণমূলের বিদায় এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দুর্নীতি ও তোষণমুক্ত রাজ্য গড়তে প্রস্তুত।”
সব মিলিয়ে, ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে মোদীর এই ঝোড়ো সফর এবং সরাসরি দুর্নীতির ফাইল খোলার হুঁশিয়ারি বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি