
গুয়াহাটি, ২১ জুন (হি.স.) : ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীই আমাদের পরিবার। এই মহান বাণী প্রাগৈতিহাসিক যুগে মহা-উপনিষদে লিপিবদ্ধ করে ঋষি-মুনিরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে উল্লেখ রয়েছে, চিকিৎসা, সমরকলা, সাহিত্য, গণিত, সংগীত, জ্যোতিষশাস্ত্র সহ বিভিন্ন বিদ্যায় সমৃদ্ধ প্রাচীন ভারতে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষের আগমন ঘটত। কথাগুলি বলেছেন অসম প্রদেশ বিজেপির মুখপাত্র প্রাঞ্জল কলিতা।
আজ রবিবার গুয়াহাটিতে অসম প্রদেশ বিজেপির সদর দফতর অটলবিহারী বাজপেয়ী ভবনে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য পেশ করছিলেন প্রাঞ্জল কলিতা। প্রাসঙ্গিক তিনি আরও বলেন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে বিভিন্ন বিদেশি আক্রমণকারী ভারতের ঐশ্বর্য ও গৌরবকে আঘাত করেছে। দীর্ঘদিন মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার পর স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে ভারতের গৌরবময় ইতিহাস পুনরুজ্জীবনের সুযোগ সৃষ্টি হলেও, কংগ্রেসের ভুল নীতি এবং দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার ফলে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের উত্থান ঘটে এবং অশান্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এর ফলে ভারত আবারও বিশ্বের অগ্রগণ্য দেশগুলির থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বহু স্থানে ভারতকে দুর্গম ও অনিরাপদ অঞ্চল হিসেবে দেখা হত।
তিনি বলেন, তবে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত পুনরায় ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার পথে এগোতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশ সফর করে ভারতের বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন, বিশ্বের মানুষের কাছে ভারতকে নতুনভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন।
অসমের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ১২টির বেশি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হয়েছে। যে অসম একসময় গুলির শব্দে মুখর ছিল, আজ সেখানে ঢোল, শঙ্খ ও হরিনামের ধ্বনি শোনা যায়।
কংগ্রেস আমলে অসম সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যে দেশ ও বিশ্বের মানুষ দুর্গম ও অনিরাপদ বলে মনে করত, বিজেপি সরকারের আমলে সেই অঞ্চল এখন পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কাজিরঙা জাতীয় উদ্যানে নৈশযাপন করে আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্যানটির প্রচার করে কার্যত অসম পর্যটনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরে পরিণত হয়েছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মোট ৫ লক্ষ ৪৮ হাজার পর্যটক কাজিরঙা ভ্রমণ করেছেন। এছাড়া গত বছর ৭০ লক্ষের বেশি যাত্রী অসমের বিমানবন্দরগুলি ব্যবহার করেছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ৮ এবং ৯ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের প্রতিনিধি দল অসম সফর করার পর বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিবেচনা করে ২০ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে জানান, সদস্য রাষ্ট্রগুলির নাগরিকদের অসম ভ্রমণের ওপর জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রাঞ্জল কলিতা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত অসমের পর্যটন শিল্পে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। ‘ব্লু-ভ্যালি ক্লাস্টার’-এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনের উদ্যোগের পাশাপাশি এই সিদ্ধান্ত পর্যটন ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানও তাদের নাগরিকদের জন্য অসম-সংক্রান্ত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মার প্রচেষ্টায় অসম এখন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, বলেন তিনি।
প্রাঞ্জল বলেন, অসম সরকার হোমস্টে নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করায় রাজ্যের বহু যুবক-যুবতী স্বনির্ভর হতে সক্ষম হয়েছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার বাজেটে অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বৌদ্ধ পর্যটন সার্কিটের অন্তর্ভুক্ত করায় পর্যটন ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
এছাড়া অসমকে ‘কনসার্ট হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংগীতশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যার ফলে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছেও অসম একটি জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ ও আইপিএল সহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা রাজ্যের স্টেডিয়ামগুলিতে আয়োজিত হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিজেপি সরকারের আমলে অসমের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদানও প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার উদ্যোগে অসমের পর্যটন শিল্পে যেমন নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে, তেমনি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে, সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন মুখপাত্র প্রাঞ্জল কলিতা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস