
বেঙ্গালুরু, ২৪ জুন (হি.স.) : উত্তর প্রদেশ এখন দেশের শিল্প ও বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা, বিশ্বমানের পরিকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং শিল্পবান্ধব নীতির জোরে রাজ্যটি এখন ভারতের থ্রি-এস মডেল—সেফটি, স্টেবিলিটি ও স্পিড-এর প্রতীক বলে দাবি করলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
বুধবার বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত 'উত্তর প্রদেশ গ্লোবাল গ্রোথ ডায়ালগ ২০২৬'-এর রোড শো-তে দেশের শীর্ষ শিল্পপতি, কর্পোরেট প্রতিনিধি এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে উত্তর প্রদেশে শিল্পোন্নয়নের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর কথায়, শিল্পের জন্য নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন ক্ষেত্রেই উত্তরপ্রদেশ এখন দেশের সামনে উদাহরণ।
যোগী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে গত ১২ বছরে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে। সেই উন্নয়নের ধারায় গত নয় বছরে উত্তর প্রদেশও আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। একসময় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দুর্বল প্রশাসন, নীতিগত অচলাবস্থা এবং 'বিমারু রাজ্য'-র তকমায় চিহ্নিত উত্তর প্রদেশ আজ দেশের শীর্ষ তিন অর্থনীতির একটি।
তিনি জানান, বর্তমানে উত্তর প্রদেশে বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। দেশের মোট এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই উত্তর প্রদেশে রয়েছে। রাজ্যে রয়েছে ১৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি রেল নেটওয়ার্ক এবং প্রায় চার লক্ষ কিলোমিটার সড়কপথ। এছাড়া বারাণসী-হলদিয়া জাতীয় জলপথ, দিল্লি-মেরঠ র্যাপিড রেল, সাতটি শহরে মেট্রো পরিষেবা, পূর্ব ও পশ্চিম ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরের সংযোগ এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক ও ১১টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর উত্তর প্রদেশকে দেশের অন্যতম সেরা সংযুক্ত রাজ্যে পরিণত করেছে। আরও পাঁচটি নতুন বিমানবন্দরের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক উড়ান শুরু হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নত আইন-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীল প্রশাসনের ফলেই উত্তর প্রদেশ বিগত ছয় বছর ধরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়েছে। গত নয় বছরে রাজ্যের অর্থনীতি ও মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প স্থাপনের জন্য বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার একর ল্যান্ড ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে এবং ৩৬টি পৃথক শিল্পনীতি কার্যকর রয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ২৭টি শিল্প ও লজিস্টিক ক্লাস্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি 'বিডা' প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী গড়ে তোলার কাজ চলছে।
শিল্পের জন্য দক্ষ মানবসম্পদের অভাব হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন যোগী আদিত্যনাথ। তিনি জানান, উত্তর প্রদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই লক্ষ স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) স্নাতক বের হচ্ছেন। রাজ্যে দুটি আইআইটি, একটি আইআইএম, তিনটি স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং বিস্তৃত কারিগরি শিক্ষার পরিকাঠামো রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, ডেটা সেন্টার-সহ উদীয়মান প্রযুক্তি ক্ষেত্রের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, গত নয় বছরে উত্তর প্রদেশের কৃষি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। পাঁচটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৮৯টি কৃষক উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সংযুক্ত করা হচ্ছে। দেশের মধ্যে সর্বাধিক, প্রায় ৮৬ শতাংশ সেচসুবিধাপ্রাপ্ত কৃষিজমি উত্তর প্রদেশেই রয়েছে।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) ক্ষেত্রেও উত্তর প্রদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে রাজ্যে ৯৬ লক্ষেরও বেশি এমএসএমই ইউনিট রয়েছে। 'ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট' (ওডিওপি ) প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের প্রসার ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
যোগী আরও বলেন, গত নয় বছরে উত্তর প্রদেশে ১৮ হাজারেরও বেশি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আগে যেখানে রাজ্যে বড় কারখানার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ হাজার, বর্তমানে তা বেড়ে ৩৩ হাজারেরও বেশি হয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্প করিডর, ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, টেক্সটাইল, নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রেও দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ডাবল ইঞ্জিন সরকার প্রত্যেক শিল্পপতিকে নিরাপদ পরিবেশ, সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেবে। তিনি বলেন, উত্তর প্রদেশের সম্ভাবনার কথা শুধু শোনা নয়, সেখানে বিনিয়োগ করে তা প্রত্যক্ষ করার জন্য তিনি শিল্পমহলকে আহ্বান জানাতে বেঙ্গালুরু এসেছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর প্রদেশের অর্থমন্ত্রী সুরেশ কুমার খান্না, ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কমিশনার দীপক কুমার, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব (শিল্প) অলোক কুমার, প্রধান সচিব (তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স) অলোক কুমার, ইয়েডার সিইও আর. কে. সিং এবং বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্তা ও বিনিয়োগকারীরা।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য