
নয়াদিল্লি, ২২ জুলাই (হি.স.): নিট-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি এবং আন্দোলনরত পড়ুয়াদের উপর পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ কার্যত ‘রিগড সিস্টেমে’ পরিণত হয়েছে। পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করা হচ্ছে। তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পড়ুয়াদের উপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে দেশের পড়ুয়াদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
বুধবার নতুন দিল্লিতে কংগ্রেসের নতুন সদর দফতর ইন্দিরা ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে ২০ জুলাইয়ের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি এবং যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের বিভিন্ন ভিডিও ও তথ্যচিত্র তুলে ধরে রাহুল গান্ধী বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো পড়ুয়াদের উপর পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী বলপ্রয়োগ করেছে। তাঁদের মারধর করা হয়েছে, টেনে হিঁচড়ে সরানো হয়েছে। তাঁদের দাবি শোনার পরিবর্তে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তোলেন, “পড়ুয়াদের অপরাধটা কী? তাঁরা তো শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছেন। তাঁরা তাঁদের অধিকার এবং দেশের কাছে প্রাপ্য জিনিসটুকুই চাইছেন। তাঁরা চাইছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ন্যায্য হোক।” তাঁর দাবি, পড়ুয়াদের উপর অস্ত্র তাক করা হচ্ছে, অথচ তাঁদেরই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দায়িত্ব সরকারের।
তিনি বলেন, “শিক্ষা শেষ করে কেউ ডাক্তার বা আইনজীবী হওয়ার পরেও যখন কর্মসংস্থানের দরজা বন্ধ দেখতে পায়, তখন তার সামনে আর কী থাকে? উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ, উদ্যোগপতিদের জন্য সুযোগ নেই, সরকারি সংস্থাগুলি বেসরকারিকরণ হচ্ছে। একমাত্র সরকারি চাকরির দরজা খোলা রাখা হয়েছে। তারপর সেই ব্যবস্থাতেও প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম হলে তরুণরা রাস্তায় নামবে না তো কী করবে?”
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, গত এক দশকে দেশে ১৫২টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রায় ৭.৫ কোটি পড়ুয়া এবং তাঁদের পরিবারের উপর। তিনি বলেন, “প্রায় প্রতি মাসেই কোনও না কোনও প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ পড়ুয়াকে বলা হচ্ছে, এতদিনের পরিশ্রম ও চাপ আবার শুরু করতে হবে। অথচ গত দশ বছরে ১৫২টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় কার্যত কোনও দোষীর সাজা হয়নি।”
তিনি বলেন, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলি সন্তানদের শিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিপুল অর্থ খরচ করছে। রাহুল গান্ধীর দাবি, কেন্দ্রের বার্ষিক শিক্ষা বাজেট যেখানে প্রায় ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে প্রতি বছর শুধুমাত্র নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট খরচের জন্য দেশের পরিবারগুলি প্রায় ১.৩২ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করছে। তাঁর কথায়, “পরিবারগুলির কাছ থেকে এত টাকা নেওয়ার পর যদি বলা হয় প্রশ্নফাঁস হয়েছে, তাহলে তা নিছক অব্যবস্থা নয়—এটি তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা।”
রাহুল গান্ধী বলেন, “দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ সেটিই একটি রিগড সিস্টেমে পরিণত হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পড়ুয়াদের দীর্ঘদিন ধরে অসহনীয় চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ঠিক আগে প্রশ্নফাঁসের খবর সামনে আসছে। এর ফলে বহু পড়ুয়া চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ছে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নিশানা করে রাহুল গান্ধী বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।” তাঁর দাবি, পড়ুয়াদের আস্থা ফেরাতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, “এই প্রতীকটিকে সরাতে হবে পড়ুয়াদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য।”
রাহুল গান্ধী আরও বলেন, “আমরা ১০০ শতাংশ প্রতিটি পড়ুয়ার অনুভূতি এবং দাবির সঙ্গে একমত। কয়েকদিন আগে যা ঘটেছে, তার পরিণতি হওয়া উচিত। এর জন্য পড়ুয়ারা দায়ী নয়।”
২০ জুলাই পড়ুয়াদের ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি এবং ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের বিক্ষোভের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “যখন দেশের পড়ুয়ারা রাস্তায় রয়েছে, তখন বিরোধীদেরও রাস্তায় থাকা উচিত।” তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী আবাসনের দিকে যাওয়ার আগে তাঁরা লোকসভা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আলোচনা হয়নি।
রাহুল গান্ধী বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পড়ুয়াদের উপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে দেশের পড়ুয়াদের কাছে ক্ষমা—এই তিনটি দাবি পড়ুয়াদের। এগুলি কোনওভাবেই আলোচনাযোগ্য নয়।”
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভের সময় তাঁকে আটক করার প্রসঙ্গে রাহুল বলেন, “আমাকে আটক করা বা ধাক্কা দেওয়া বড় বিষয় নয়। দেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোই বিরোধী দলনেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব। পড়ুয়া, যুবক বা কৃষক—যেখানে মানুষের যন্ত্রণা রয়েছে, সেখানে সেই বিষয়টি তুলে ধরা আমার কাজ। কয়েকটি ঘুষি বা ধাক্কা আমার কাছে বড় মূল্য নয়। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া আমার কাছে সম্মানের।”
তিনি আরও দাবি করেন, তাঁকে আটক করার সময় কয়েকজন পুলিশকর্মীও ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন। রাহুলের দাবি, পুলিশের অনেকেই বুঝতে পারছেন যে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে।
সরকারের বিরুদ্ধে ‘আতঙ্কিত’ হয়ে পড়ার অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধী বলেন, পড়ুয়াদের উপর পুলিশের পদক্ষেপ এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আসলে সরকারের ‘প্যানিক রিঅ্যাকশন’। তাঁর কথায়, “প্রতিটি সরকারেরই এমন একটা সময় আসে যখন নেতৃত্ব মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আমার মনে হয়, এই সরকারের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
রাহুল গান্ধী জানান, কংগ্রেস পড়ুয়াদের বিষয়টি দেশজুড়ে তুলে ধরবে। প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং বেকারত্বের মতো বিষয় নিয়ে সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোর আন্দোলন চলবে বলেও জানান তিনি।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য